
শেষ আপডেট: 18 November 2023 10:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছট পুজো এবারও নিষিদ্ধ রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে। ছটপুজো উপলক্ষে ১৯ ও ২০ তারিখ বন্ধ থাকছে রবীন্দ্র সরোবর। সাধারণের প্রবেশের ক্ষেত্রে থাকছে নিষেধাজ্ঞা। শনিবার রাত ১০টার পর থেকে রবিবার সারাদিন এবং সোমবার বেলা ১২টা পর্যন্ত রবীন্দ্র সরোবরে কেউ ঢুকতে পারবে না। একইভাবে সুভাষ সরোবরও ছট পুজোর আয়োজন করা যাবে না। জাতীয় সরোবরকে দূষণের কবল থেকে বাঁচাতে এ বছরও বিশেষ উদ্যোগ নিল জাতীয় পরিবেশ আদালত ও কলকাতা পুরসভা।
রবীন্দ্র সরোবরের ১২টি গেটে বাঁশের ব্যারিকেড বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গেটগুলিতে হোডিং বোর্ড এবং ব্যানার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুভাষ সরোবরের আশপাশে টিনের অস্থায়ী শেড দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। ছট পুজো উপলক্ষে প্রতি বছরই জল দূষণ হয় রবীন্দ্র সরোবরে। গ্রিন ট্রাইব্যুনাল তাই সরোবরের ভিতরে ছট পুজো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে। সেই মতো কলকাতা পুরসভার তরফেও ছট পুজো না করার আবেদন জানিয়ে সরোবরের চার পাশে পোস্টার ও ব্যানার টাঙানো হয়। কিন্তু এর আগে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢুকে সরোবরের জলে পুজো করতে দেখা গিয়েছিল বহু মানুষকে। যার ফলে রবীন্দ্র সরোবরের বাস্তুতন্ত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়। দূষণের কারণে বহু মাছ মারা যায়।
রবীন্দ্র সরোবরে ছট পুজো উপলক্ষে যাতে এবার কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে জন্য আগে থেকেই কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে কলকাতা পুরসভা। মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, “পুরনিগম থেকে কৃত্রিম জলাশয় এবং ঘাট তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। টেম্পোরারি ঘাট ও পার্মানেন্ট ঘাট-সহ সব জায়গাতেই টিম প্রস্তুত রাখা হবে। পুলিশকেও সেটা দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।” মেয়র বলছেন, এবারে ছট পুজোর জন্য ১১৬টা ঘাট থাকছে, তার মধ্যে ২৩টা অতিরিক্ত ঘাট থাকছে। সেখানে চেঞ্জিং রুম থেকে শুরু করে সমস্ত রকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মহিলাদের জন্য শৌচালয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যেখানে দণ্ডী কাটা হবে সেখানকার রাস্তা খারাপ থাকলে সেই রাস্তার উপর প্লাস্টিক বিছিয়ে দেওয়া হবে।
সূর্য প্রণাম ও স্নানের মাধ্যমে ছট-মায়ের আরাধনা করেন ভক্তরা। প্রযুক্তি-পরিবেশবিদ সোমেন্দ্র মোহন ঘোষ বলছেন, জলের মধ্যে দুধ-তেল, ফুল, বেলপাতা-সিঁদুর সহ নানা জিনিস জলে মেশে। এইসব রাসায়নিকের কারণে জলের বাস্তুতন্ত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবেশবিদ জানাচ্ছেন, প্রতি বছরই দেখা যায় ছট পুজোর পরে প্রচুর মরা মাছ ভেসে ওঠে সরোবরের জলে। কারণই হল তেল-সিঁদুর ইত্যাদির রাসায়নিক জলে মিশে বিক্রিয়া করে। ফলে সরোবরের জলে যেসব নানা ধরনের মাছ রয়েছে তাদের উপর প্রভাব পড়ে। শুধু তাই নয়, বিচিত্র রকম গাছ রয়েছে সরোবরের জলে, সেগুলিও নষ্ট হয়ে যায় এর ফলে।
সোমেন্দ্রবাবু বলছেন, ২০১৯ সালে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই ব্যারিকেড ভেঙে রবীন্দ্র সরোবরে ছট পুজো করা হয়েছিল। পুজো শেষ হওয়ার পরদিন দেখা যায়, সরোবরের জলের গুণমানই বদলে গেছে। পুজো শেষ হওয়ার অন্তত ১০ ঘণ্টা পরে জলের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেন, জলে অক্সিজেনের মাত্রা তলানিতে পৌঁছেছে, বদলে তেল ও দূষিত গ্যাসের মাত্রা বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ফুল-বেল পাতা ইত্যাদি পচে গিয়ে জলের দূষণ বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বছরই রবীন্দ্র সরোবরের জলে অনেক প্রজাতির মাছ মারা যায় শুধুমাত্র দূষণের কারণে। করোনার জন্য ২০২০ ও ২০২১ সালে রবীন্দ্র সরোবর বন্ধ ছিল। ২০২২ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশেই কিছু সময়ের জন্য খোলা হয়েছিল সরোবরের গেট। দেখা যায় অন্তত ২৫০ পুণ্যার্থী হুড়মুড়িয়ে ঢুকে জলে পুজো করে। এতটাই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে পরদিন পুলিশকেই ব্যবস্থা নিতে হয়।
জাতীয় সরোবর কলকাতা শহরের ঐতিহ্য। পরিবেশবিদ বলছেন, সরোবরের জলের দূষণমাত্রা বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে পরিযায়ী পাখিদের উপরেও। প্রতি বছর শীতের মুখে নানা ধরনের পরিযায়ী পাখি আসতে শুরু করে জাতীয় সরোবরে। দেখা যায়, দূষণের কারণে তাদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে। অনেক বিরল প্রজাতির পরিযায়ীও আছে সরোবরে। কাজেই দূষণের মাত্রা বাড়তে থাকলে জীব ও পরিবেশের উপর তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলেই জানাচ্ছেন সোমেন্দ্র মোহনবাবু।