গাড়ি-বাস নেই, কোমরসমান জল! জরুরি পরিষেবার ডাক্তার থেকে স্কুলশিক্ষিকা— সকলে অফিসে পৌঁছলেন একসঙ্গে ম্যাটাডোরে চেপে।

রাসবিহারী মোড়— নিজস্ব চিত্র
শেষ আপডেট: 24 September 2025 09:46
সোমবার রাত থেকে কলকাতায় (Kolkata Rain) যে হারে টানা বৃষ্টি হয়েছে, তেমনটা হালফিলে দেখা যায় না। পাঁচ ঘণ্টার রেকর্ড (Kolkata Heavy Rain) বৃষ্টিতে জলমগ্ন কলকাতার অধিকাংশ এলাকা (Kolkata Flood)। ব্যাহত যান চলাচল। তার মধ্যে লাইনে জল ঢুকে পড়ায় শহরের একমাত্র লাইফলাইন মেট্রোও (Kolkata Metro) ঝুলিয়েছে। দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। এখন তাও বেশিরভাগ অফিসকর্মীরা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের (Work From Home) সুবিধা পান। তাঁদের খানিকটা হলেও এই ঝক্কি পোহাতে হয়নি। কিন্তু জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত এমন অনেকেই আছেন যাঁদের ঘরে বসে কাজ করার উপায় নেই। ডাক্তার, নার্স থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা শোকজ নোটিস পাওয়ার ভয়ে তাই মঙ্গলবার বাধ্য হয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। কিন্তু গোটা শহর জুড়ে যানবাহনের তেমন বহর না থাকায় সহায় হয়ে উঠেছে ছোট হাতি (ম্যাটাডোর)। তাতে চড়েই অফিসমুখী হয়েছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ— গোটা শহর কার্যত বিপর্যস্ত। সর্বত্রই কমবেশি সমস্যার মুখে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বহু গলিপথ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে, নানা এলাকায় রাস্তাজুড়ে জমেছে জল। কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের দাবি, যেসব রাস্তায় আগে কখনও জল জমার নজির ছিল না, সেইসব জায়গাও এবার তলিয়ে গেছে বৃষ্টির জলে।
যত দ্রুত সম্ভব জমা জল নামানোর কাজ শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রবল বৃষ্টি চলতে থাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় জল নামতে অনেক বেশি সময় লাগছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই যানচলাচল স্তব্ধ। যে কারণে বেশিরভাগ অফিযাত্রী একসঙ্গেই চেপে বসেছেন, থুড়ি দাঁড়িয়েছেন ছোট হাতিতে, সহজ করে বললে ম্যাটাডোরে। যাঁদের মধ্যে কেউ ডাক্তার, কেউ নার্স, কেউ স্কুলের শিক্ষিকা। যাঁদের নিজস্ব গাড়ি আছে, তাঁরাও কোমর সমান জলে তা বের করেননি। চরম দুর্ভোগের মধ্যেও একসঙ্গে হইহই করে তাঁরা ম্যাটাডোরে চেপে স্কুলে, হাসপাতালে গেলেন।
আসলে এমন অভিজ্ঞতা তো খুব একটা শহুরে মানুষদের হয় না, তাই দিনটার কথা মনে রাখতে দেদার সেলফিও তুললেন তাঁরা। কেউ কাউকে চেনেন না, অথচ কলকাতার বৃষ্টি তাঁদের এক করে দিয়েছে। বিরক্তিকর দুর্ভোগের মাঝেও এ যেন এক পশলা মজা। যার সাক্ষী থাকল কলকাতা।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বালিগঞ্জ এলাকায়— ২৯৫ মিলিমিটার। এর পরেই রয়েছে মুকুন্দপুর (২৮০ মিমি), গড়িয়া (২৭০ মিমি), যাদবপুর (২৫৮ মিমি), গড়িয়াহাট (২৬২ মিমি) ও কসবা (২৪৬ মিমি)। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে উত্তর কলকাতার সাউথ দমদমে, মাত্র ৬১ মিমি।
এদিন সকালে প্যান্ট গুটিয়ে, পোলো শার্ট পরে পুরসভায় পৌঁছে যান মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তার সাংবাদিকদের বলেন, “বৃষ্টি ও নিম্নচাপে সমুদ্র উত্তাল হয়ে রয়েছে। নদীতে টগমগ করছে জল। খাল উপচে পড়ছে। ফলে পুরসভা থেকে ড্রেনেজ সিস্টেমে জল ফেলতে গেলেও তা ব্যাক ফ্লো হয়ে আবার শহরে ঢুকে পড়ছে। জল খালে না গেলে শহর থেকে জল নামবে কী করে!”
তিনি জানিয়েছেন, দুপুর দেড়টায় হুগলি নদীতে বড় বান আসার কথা। তাতে জোয়ারের জল উঠবে আবার। সেটা কেটে গেলে তবেই কলকাতার জল নামানো সম্ভব হবে। মোট কথা, বৃষ্টি না হলেও গোটা শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগবেই।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপের জেরেই টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কলকাতা। আবহাওয়াবিদরা আগেই জানিয়েছিলেন, ষষ্ঠীর দু’দিন আগে নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আর সেই প্রভাবেই পুজোর সময়ে বৃষ্টি হতে পারে।
আগামী বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ তৃতীয়াতেই সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু তার আগেই সোমবার রাতভর অতি ভারী বৃষ্টিতে কার্যত নাজেহাল শহরবাসী। দুর্গাপুজোর আগে এমন বৃষ্টিতে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। এই বৃষ্টির দাপটে ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক পুজো প্যান্ডেল। ফলে উৎসবের আগে আকাশের এমন মেঘলা মেজাজে দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।