.jpeg)
মিত্রা সিনেমা হল।
শেষ আপডেট: 23 January 2025 18:50
কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, বর্তমানে বিধান সরণী, একসময় এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল ঐতিহ্যবাহী 'চিত্রা' সিনেমা হল। পরে যার নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় 'মিত্রা'। এই প্রেক্ষাগৃহ উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। যদিও আজ হলটি বন্ধ হয়ে সেখানে হয়েছে শপিং মল, তবু নেতাজির স্মৃতির আলোয় আজও তা উজ্জ্বল।

নেতাজির ১২৮তম জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক সেই ঐতিহাসিক দিনটি। ১৯৩০ সালের ২০ ডিসেম্বর, কলকাতার তৎকালীন মেয়র নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু চিত্রা থিয়েটারের উদ্বোধন করেন। সিনেমা হলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নিউ থিয়েটার্সের কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকার, যিনি চলচ্চিত্র জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। কলকাতার হিন্দু স্কুলের ছাত্র বীরেন্দ্রনাথ পরে লন্ডনে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করে ফিরে আসেন। পরিকাঠামোর অভাব থাকলেও তিনি চলচ্চিত্রে নিজের ভালবাসা ও উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে নিউ থিয়েটার্স প্রতিষ্ঠা করেন।
চিত্রা সিনেমার প্রথম প্রদর্শিত ছবি ছিল ‘শ্রীকান্ত’, যা রাধা ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত। হল উদ্বোধনে বিশাল জনসমাগম হয়, যা সামলাতে বিএন সরকার কলকাতা ময়দানের পালোয়ান জব্বর আলিকে দায়িত্ব দেন। নেতাজির শর্ত ছিল, হলের সামনে কোনও ব্রিটিশ পুলিশ মোতায়েন করা যাবে না, যাতে তাঁর আগমনে কোনও বাধা না আসে।
নিউ থিয়েটার্স এবং ‘চিত্রা’র স্বর্ণযুগ
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিউ থিয়েটার্স একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান, যা শুধুমাত্র বাংলা ছবি বানানোতেই মনোযোগ দিয়েছিল। সাহিত্য নির্ভর সিনেমা, বাঙালি পরিচালক-শিল্পী এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার। তবে সময়ের সাথে, হিন্দি সিনেমার প্রভাবও পড়তে শুরু করে চিত্রা প্রেক্ষাগৃহে। এই নিয়ে নিউ থিয়েটার্সের নীতিগত বিরোধ দেখা দেয়, যার ফলে অভিনেতা দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান।
শুধু সিনেমা নয়, বাংলা সংস্কৃতি বিকাশেও চিত্রার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে কাজি নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করেছিলেন, যা প্রথমে বিশ্বভারতী অনুমোদন দেয়নি। পরে নজরুল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে ছবি দেখিয়ে অনুমোদন আদায় করেন। এভাবেই ‘চিত্রা’ সিনেমা বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
‘চিত্রা’ থেকে ‘মিত্রা’— পরিবর্তনের অধ্যায়
১৯৬৩ সালের পয়লা বৈশাখে, চিত্রা সিনেমা বিক্রি হয়ে যায় হেমন্তকুমার মিত্রের হাতে, এবং তার নাম বদলে রাখা হয় ‘মিত্রা’। সেই দিন উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন অতুল্য ঘোষ ও বীরেন্দ্রনাথ সরকার। উত্তর কলকাতার মানুষের কাছে ‘মিত্রা’ হয়ে ওঠে নস্টালজিয়ার এক প্রতীক। উত্তম-সুচিত্রা থেকে দেব-রুক্মিণী, নানা প্রজন্মের সিনেমাই এখানে প্রদর্শিত হয়েছে।

কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে, মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির ঢেউয়ে মিত্রাও বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯ সালের পয়লা বৈশাখে। এখন সেখানে শপিং মল।
বাঙালির হল সংস্কৃতির অবক্ষয়
এক সময় সারারাতব্যাপী সিনেমা দেখার সংস্কৃতি ছিল ‘মিত্রা’য়। জন্মাষ্টমী, শিবরাত্রির রাতে ঘোড়ার গাড়ি করে আসা বাঙালি পরিবারের মহিলারা হলের পরিবেশকে মুখর করে তুলতেন। তবে মাল্টিপ্লেক্সের আগ্রাসনে সেই সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত।
বাঙালির সিনেমাপ্রেম আজ সোশ্যাল মিডিয়া আপডেট আর বিলাসবহুল প্রেক্ষাগৃহে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সেই সুদিন ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা দরকার, যাতে নেতাজির স্মৃতিধন্য ‘মিত্রা’ আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তথ্য ও সূত্র: সাত্যকি ভট্টাচার্য, দীপেন মিত্র, তমাল দাশগুপ্ত এবং কালীশ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রূপমঞ্চ’ পত্রিকা।