স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিবসের পরদিন নাকতলায় অনাথ মেয়েদের মধ্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করল সরস্বতী ভাণ্ডার। ঋতুচক্র স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে এই উদ্যোগ।

সরস্বতী ভাণ্ডারের উদ্যোগে অনাথ কিশোরীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ
শেষ আপডেট: 15 January 2026 14:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনের (Swami Vivekananda Birthday) ঠিক পরেই কলকাতায় দেখা গেল এক অনন্য ছবি। ১২ জানুয়ারি শহর জুড়ে যখন ধূমধাম করে পালন হল স্বামীজির জন্মতিথি—সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, বক্তৃতা—সব মিলিয়ে আগের মতোই ছিল উৎসবের আবহ। কিন্তু ১৩ জানুয়ারি সকালে সেই আয়োজনে এক অন্য মাত্রা যোগ করল ‘সরস্বতী ভাণ্ডার’। নামটির সঙ্গে যেমন যুক্ত আছে শিক্ষার, ভাষার ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার দাবি, তেমনই এবার তারা হাত বাড়াল মেয়েদের নীরব স্বাস্থ্য সংকটের দিকে।
সেদিন নাকতলার ‘শৈশব – এ ফাউন্ডেশন ফর চিলড্রেন’-এ উপস্থিত ছিলেন সংস্থার কর্ণধার ঝর্ণা ভট্টাচার্য। সেখানে থাকা অনাথ কিশোরীদের হাতে তিনি তুলে দেন স্যানিটারি প্যাড। শুধু প্যাড দেওয়া নয়—সঙ্গে ছিল ঋতুচক্র পরিচর্যা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে দীর্ঘ কথোপকথনও। স্বামীজির জন্মদিনের মতোই এদিন তিনি সামনে আনলেন তাঁর কথায়, “মানুষকে শক্তিশালী, জ্ঞানে উন্নত, মূল্যবোধে দৃঢ় করার” অঙ্গীকার।

ঝর্ণার ভাষায়, “স্বামীজি আমাদের প্রতিদিনই শেখান কী ভাবে উদার হতে হয়, কী ভাবে উত্তরণ ঘটে মানুষের। তাই ১২ তারিখ তাঁর জন্মজয়ন্তী পালন করা হল, আর পরদিন আমরা তাঁকে অঞ্জলি দিলাম কাজের মাধ্যমে। আমরা বলতে চাইলাম—স্বামীজিকে শুধু অনুষ্ঠানে রাখা যায় না, তাঁকে রাখতে হয় দৈনন্দিন নীতি, মূল্যবোধ আর দায়িত্বে।”
এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা যে প্রবল, তা জানাতে গিয়ে ঝর্ণা তুলে ধরলেন মেয়েদের নীরব সংগ্রাম। শহরে কিংবা গ্রামে—স্যানিটারি প্যাড আজও অনেকের কাছে বিলাসবস্তু। দাম বাড়লে প্রথমেই বাদ যায় প্যাড কেনা। অনাথ মেয়ে হোক বা খেটেখাওয়া পরিবারের কিশোরী—চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে প্যাড বদলানো তাদের কাছে প্রায়ই অসম্ভব। নিত্যদিন খাবার, বস্ত্র, ওষুধ, পানীয়—এসব মিলতেই লড়াই; প্যাডকে কোথায় রাখবে সেই তালিকায়?

ফলেই বাড়ছে বিপদ। ঋতুচক্র চলাকালীন অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের জায়গায় জায়গায় দেখা যাচ্ছে জরায়ুর ক্যান্সার, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, এমনকি আরও নানা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অথচ প্যাড ট্যাক্সমুক্ত হলেও বাজারে দাম কমে না, আর কম দামের প্যাড থাকলেও বহু মেয়েদের কাছে তা অপ্রাপ্য।
এই প্রেক্ষিতেই ঝর্ণার মন্তব্য, “যদি আমাদের আগামী প্রজন্ম সুস্থ না থাকে, তাহলে স্বামীজির জন্মদিন পালন করার সঠিক অর্থই হারিয়ে যায়।” তাই কেবল প্যাড বিলি নয়—কিশোরীদের বোঝানো হল ঋতুচক্রকালে কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, কেন পরিচ্ছন্নতা জরুরি, ভবিষ্যতে বিপদ কোথায়।
প্রতিবেদনের শেষে সমাজ ও রাষ্ট্রের উদ্দেশে স্পষ্ট আহ্বান, এই সমস্যাটিকে অন্ধকার কোণ থেকে আলোয় আনতে হবে। “কাগজে-কলমে ট্যাক্স উঠেছে, বিজ্ঞাপনে সচেতনতার প্রচার চলছে, কিন্তু বাস্তবে মাটিতে পরিস্থিতি কঠিন। সরকার ও সমাজ এগিয়ে এলে আগামী প্রজন্ম সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে,” জানালেন ঝর্ণা ভট্টাচার্য। এ যেন স্বামীজির জন্মদিনে ফুল বা মালা নয়, বরং জীবনের কাছে সশরীরে অঞ্জলি।