
অপর্ণা সেন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুবোধ সরকার, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 19 December 2024 18:34
আগের মতো সেই মজা আর নেই কলকাতা শহরের। নেই সেই বুদ্ধিদীপ্ত খ্যাপামি। এ শহর যেন এখন বড়ই মধ্যমেধার এক শহর। অনেকটা যেন একঘেয়ে ডেলিসোপের মতো।– অভিমান ভরা অভিযোগের সুরে এমনই মন্তব্য করেছেন অপর্ণা সেন (Aparna Sen)। ব্যক্ত করেছেন, ছোটবেলার সেই কলকাতার আনন্দ তিনি আর অনুভব করেন না।
কিন্তু সত্যিই কি তাই? কল্লোলিনী কলকাতা কি হারিয়ে ফেলেছে তার আনন্দের কল্লোল? তিলোত্তমার সৌন্দর্য কি আজ একটু হলেও ভোঁতা হয়েছে? এই উত্তর খুঁজতে গিয়েই এ কলকাতা শহরের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বিশিষ্ট জনেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ‘দ্য ওয়াল’। সেখান থেকেই আরও কিছু ধারণা পাওয়া গেল, শহর কলকাতার পরিবর্তন ও সে পরিবর্তনের যাত্রাপথ নিয়ে।
তার আগে জেনে নেওয়া যাক, অপর্ণা সেনের মন্তব্যের প্রেক্ষপট।
সামনেই মুক্তি পেতে চলেছে অপর্ণার নতুন সিনেমা 'পরমা'। তার আগে 'দ্য ওয়াল'-এ এক্সক্লুসিভ এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে আরজি কর আন্দোলনের কথা। আরজি করের মঞ্চে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা তাঁর সঙ্গে ঘটেনি বলে উল্লেখ করে অপর্ণা বলেন, শহরের প্রতি তাঁর ভালবাসাটা কমে গেছিল নানা কারণে। তবে আরজি কর কাণ্ডে এত মানুষের পথে নামা দেখে সে ভালবাসার অনুভূতি আবার ফিরে আসে।
তাঁর কথায়, ‘এমন গণঅভ্যুত্থান হয়নি কখনও। সুতরাং একটা ভালবাসার জোয়ারও আবার আমার মনে এল নতুন করে।’ কিন্তু সেই সঙ্গেই অপর্ণার আক্ষেপও রয়েছে এই কলকাতাকে নিয়েই। বললেন, ‘এ শহরের মধ্যে একটা খ্যাপামি ছিল, আমরা যখন ছোট ছিলাম, শহরের মধ্যে এক ধরনের মজা ছিল। একটা বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাপার ছিল।’
অপর্ণার অভিমানে ভরা অভিযোগ, ‘সেই সব চলে গিয়ে পাতি মধ্যবিত্ত, একটা ডেলি সোপের শহর হয়ে গিয়েছে। এটা আমার ভাল লাগে না।’
অপর্ণা যে খুব ভুল বলেছেন, তা মনে করেন না বাংলা সাহিত্যের শীর্ষলেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘আমি কোনও বিরূপ মন্তব্য করব না, তবে, হ্যাঁ, শহরের মজাটা খানিক কমেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন যে সব মন্তব্য দেখি, তা রীতিমতো ভয়ের। রুচিহীন।’
বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকের বক্তব্য, ‘সবকিছুরই যাচ্ছেতাই একটা প্রকাশ দেখি। এগুলো আমাদের খুব একটা ভাল লাগে না। এ, ওকে গালাগাল দিচ্ছে, ও আবার অন্যকে গালাগাল দিচ্ছে। আর দেখছি মানুষের ধৈর্য্যচ্যুতি। সবেতেই মানুষ এখন প্রতিক্রিয়া দিয়ে চলে। রেগে যায়। কখনও গালগাল কখনও অতি আক্রমণ করে, কখনও অপমান করে একে অপরকে। এ সব দেখে অপর্ণা যে খুব বলেছে, বলে মনে হয় না।’
কবি সুবোধ সরকার অবশ্য অপর্ণা সেনের খুবই গুণমুগ্ধ হলেও, তাঁর মতামতের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তিনি বলেন, ‘একজন কিংবদন্তি নায়িকা হিসেবে অপর্ণাকে চিনে আসছে বাঙালি। তাঁর ছবি দেশ-বিদেশে আদৃত এবং পুরস্কৃত। তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। কলকাতা শহর সম্পর্কে যা বলেছেন, তা একেবারেই ওঁর ব্যক্তিগত মতামত।’
সুবোধবাবু আরও জানান, তিনি কলকাতার বাইরে থেকে জীবিকার টানে শহরে এসেছিলেন চল্লিশ বছর আগে। তারপর থেকে এই শহরকে ভালবেসেছেন। এই চল্লিশ বছরে শহরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। কলকাতা তাঁকে হতাশ করে। দুঃখ দেয়। কিন্তু কলকাতা তাঁকে নতুন করে বাঁচতেও শেখায়।
তাঁর কথায়, ‘কলকাতাকে কখনও মনে হয়নি মধ্যবিত্ত শহর। কলকাতা সংস্কৃতির শহর। কবিতার শহর। গানের শহর। চলচ্চিত্রের শহর। কলকাতা চিরজীবিতের শহর। আমার কাছে কলকাতা, কালচারাল ক্যাপিটাল অফ দ্য কানট্রি!’
এই প্রতিক্রিয়ার কথা শুনে পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় জানালেন, যে বক্তব্য অপর্ণা সেন রেখেছেন, তার মধ্যে মিথ্যে কিছু নেই। কমলেশ্বরের কথায়, ‘বিষয়টি যা ছিল, আমাদের শহর প্রতিবাদহীন হয়ে উঠেছিল। সেই প্রতিবাদহীন শহর কূপমন্ডূক ছিল। একটা এঁদো পুকুরের মতো স্থির হয়েছিল। এরপর যা ঢেউ উঠেছে অবশ্যই একটা কল্লোল উঠেছে। আর এই ঘটনা যে ঘটেছে তাতে আমি খুশি।’
এর পরেই অপর্ণা সেনের মধ্যবিত্তের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, উনি বোঝাতে চেয়েছেন আগে যেই ভাইব্রেন্স ছিল আমাদের বেড়ে ওঠার শহরে, কিন্তু এখন সেই শহরে প্রশ্নাতীত আনুগত্য তৈরি হয়েছে। এবং তা সর্বক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি। শহরটা কিছুটা বদলেছে। তাতে কোনও সন্দেহ নেই।’
তবে এই পরিস্থিতিতেও আশার আলোও রয়েছে বলেই মনে করেন কমলেশ্বর। বলেন, নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে, তাঁদের নিজস্ব বক্তব্য রয়েছে। ‘আশা করি, কলকাতা যেই কল্লোলিনী তিলোত্তমা ছিল, তাই আবার হয়ে উঠবে।’—বলেন তিনি।