
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুব্রত বক্সী
শেষ আপডেট: 16 March 2025 11:03
কূটনৈতিক সম্পর্ক হলে বলা যেতে পারত এ এক নয়া অক্ষ! তবে সে সব ভারী শব্দ। সহজ রাজনীতির কথা বলা যায়, তালমিল। শনিবার ভূতুড়ে ভোটার খোঁজার বৈঠকে চুম্বকে যা ঘটেছে তা অনেকের সামনেই জলের মতো স্বচ্ছ। তৃণমূলের সংগঠনের রাশ যে পুরোটাই এখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তা নিয়ে আর কোনও রহস্যের বাকি নেই। শুধু এ টুকু ভুলে গেলে চলবে না, এখনও সবার উপরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সত্য।
কিন্তু সেই সহজ, আপাত নজরে দেখতে পাওয়া ছবিটার বাইরেও শনিবার তৃণমূলের বৈঠকের আর একটি ছবি আছে। তা অনুসন্ধান করতে চাইলে অনুপম রায়ের গানের মতো বলতে হবে, ‘গভীরে যাও আরও গভীরে যাও..’।
সেই গভীরতায় ডুব দিলে দেখা যাবে দুটি মানুষকে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে। এবং তাঁদের তালমিলকে। বাংলায় শাসক দলের রাজনীতিতে এ এক নয়া অক্ষ। নয়া সখ্য।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এই অক্ষ বা সখ্য তাৎপর্যপূর্ণ?
তৃণমূলের জন্ম সময় থেকে সুব্রত বক্সী দলের রাজ্য সভাপতি। এক টানা এতদিন কোনও রাজনৈতিক দলের রাজ্য সভাপতি পদে থাকা ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা। সেদিক থেকে তৃণমূলের ‘বক্সীদা’ গিনেস থেকে লিমকা বুকে নাম লেখাতে পারেন। এহেন সুব্রত বক্সীর বরাবরই একটাই ইউএসপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ষোল আনার উপর আঠারো আনা আস্থাবান। অনেকটা দিদির নায়েব মশাইয়ের মতো।
অভিষেকের ব্যাপারে সমস্যা ছিল, তিনি দলের সাংগঠনিক সংস্কারের কথা বলতেই প্রবীণ ও বর্ষীয়াণ নেতাদের একাংশ হই হই করে উঠতেন। অভিষেকের প্রস্তাব ছিল, দলে এক ব্যক্তি এক পদ বাস্তবায়িত হোক। তাঁর এও প্রস্তাব ৭০ বছরের বেশি বয়সিদের বিধানসভা বা লোকসভায় টিকিট না দেওয়াই ভাল। তাঁর আরও মত, পারফরমেন্স ও কার্যকারিতার নিরিখে পদ দেওয়া হোক।
বলাবাহুল্য এই সব শর্ত ও সূত্র অনেকেরই স্বার্থে আঘাত করার মতো। দীর্ঘদিন ধরে এক বা একাধিক পদে থেকে যাঁদের একাংশের শিকড় গজিয়ে গিয়েছে। সুতরাং কখনও প্রকাশ্যে কখনও আড়ালে কখনও বা দিদির কানের কাছে গিয়ে তাঁরা লাগাতার অভিষেকের বিরুদ্ধে ইনিয়ে বিনিয়ে বলে গিয়েছেন।
ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে নতুন এক দৃশ্যে সুব্রত বক্সীর প্রবেশ ঘটে। গত কয়েক মাস ধরে সুব্রত বক্সীকে তাঁর ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে ডেকে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছেন অভিষেক। রাজ্য সভাপতিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কেন পারফরমেন্সের ভিত্তিতে পদ দেওয়া উচিত। দলকে দীর্ঘমেয়াদ ধরে শক্তিশালী রাখতে গেলে কী কী করা দরকার? কেন এক দফতরে এক টানা ১৩ বছর ধরে কারও মন্ত্রী থাকাটা ঠিক নয়। কেন বদল জরুরি।
সূত্রের খবর, অভিষেকের যুক্তিতে ষোল আনা কনভিনসড তথা সম্মত সুব্রত বক্সী। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি বলেছেন, অভিষেক ঠিক কথাই তো বলছে।
এর মানে বৃহত্তর। সুব্রত বক্সীর মতো একজন বর্ষীয়ান নেতা যদি নবীন অভিষেকের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত হন এবং তা সঙ্গত বলে মেনে নেন, তাহলে তৃণমূলে নবীন-প্রবীণ বিতর্কটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। অভিষেক নবীন এবং প্রবীণদের ব্যাপারে তাঁর মত অযৌক্তিক বলে যে সমালোচনা কেউ কেউ দাগিয়ে দিচ্ছিলেন, তা ভোঁতা হয়ে যায়।
শনিবার সেটাই হল। তৃণমূলের ভার্চুয়াল বৈঠকে সুব্রত বক্সী বারবার বলেছেন, অভিষেক আমাদের নেতা, আমাদের সবার নেতা, আমার নেতা। তিনি এভাবে অভিষেককে নেতা বলে মনে মেনে নেওয়ার পর, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের মত ও পথের বিরুদ্ধাচরণ করার বা সমালোচনার করার কারও সাহস হবে না বলেই মনে হয়। অর্থাৎ অভিষেকের পথ মসৃণ হয়ে গেল। কালীঘাট ঘনিষ্ঠ তৃণমূলের এক নেতার কথায়, বক্সীদা আগে শুধু দিদির নায়েব মশাই ছিলেন এখন অভিষেকেরও নায়েব মশাই।
এটা অভিষেকের জন্যও ভাল। দলের নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে আলোচনায় তাঁর নতুন বল হলেন সুব্রত বক্সী। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে এই তিন জনের বৈঠকে অন্তত এক জন থাকবেন, যিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী বলতে পারবেন ‘অভিষেক ঠিকই তো বলছে’।
সুব্রত বক্সীর জন্যও ব্যাপারটা মন্দ হল না। তৃণমূলে অনেকেই বলেন, বক্সীদার জীবনে একটাই লক্ষ্য। দলের রাজ্য সভাপতি পদে থেকে যাওয়া। গত কয়েক মাসে যে ধরনের ঘটনাক্রম চলছিল, তাতে দলেরই এক দক্ষিণ কলকাতার নেতা রাজ্য সভাপতির পদে দিকে তাকাতে শুরু করেছিলেন বলে জল্পনা রয়েছে। বাকি অনেকের ব্যাপারে এবং তাঁদের কাজকর্ম নিয়ে বক্সীবাবু প্রীত নন। বরং তিনি মনে করেন, অভিষেক অন্তত দলের জন্য খাটছে ও ভাবছে। নয়া সমীকরণ তাঁর জন্যও তাই ভাল। তাঁর রাজ্য সভাপতি পদটাও নিরাপদ রইল। তৃণমূলের সংগঠনে ক্রমশ সংস্কার তাই এখন সময়ের অপেক্ষা।