
শেষ আপডেট: 4 May 2023 09:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁর বয়স ৭৪। তার মধ্যে ৭১ বছর তিনি কাটিয়ে ফেলেছেন 'যুবরাজ' হয়েই। তিনি কবে সিংহাসন পাবেন বা আদৌ পাবেন কিনা— এই নিয়েই জল্পনা চলেছে দীর্ঘদিন। অবশেষে সেসব মিটেছে। তিনিই বসে পড়েছেন সিংহাসনে। ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রবীণতম রাজা হিসেবে। আগামী শনিবার, ৬ মে, তাঁর 'রাজ্যাভিষেক' হবে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে। সরকারিভাবে 'যুবরাজ' থেকে তিনি হবেন 'রাজা তৃতীয় চার্লস' (King Charles Coronation)— ব্রিটেন এবং পৃথিবীতে তার ১৪-টি কমনওয়েলথ অঞ্চলের। উপস্থিত থাকতে চলেছেন তাবড় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। ভারত থেকে থাকতে চলেছেন সম্ভবত উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়।

চলুন, এই সুযোগে দেখে নেওয়া যাক রাজা চার্লসকে নিয়ে কিছু তথ্যঃ
১। রাজা চার্লস আর জওহরলাল নেহরুর জন্মদিন এক। চার্লসের জন্ম হয় ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর, অস্ত্রোপচারের দ্বারা, রাত সোয়া ন'টায়, বাকিংহাম প্রাসাদে। তাঁর পিতা ফিলিপ তখন সেখানে ছিলেন না। শোনা যায়, তিনি নাকি 'টেনশন' কমাতে স্কোয়াশ খেলতে গিয়েছিলেন।
২। মাত্র তিন বছর বয়সেই তাঁর দাদু— তৎকালীন ব্রিটেনের রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ছাপ্পান্ন। চিকিৎসকের বহু বারণ সত্ত্বেও তীব্র ধূমপান আসক্তি কমাতে পারেননি তিনি। তাঁর শাসনকাল ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম বর্ণময় সময়। দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পরমাণু বিস্ফোরণ, কার্যত টুকরো হয়ে যাওয়া ইউরোপ। ভারতবর্ষ তাঁর শাসনেই স্বাধীনতা লাভ করে। তাঁর মৃত্যুতে সিংহাসনে বসেন মা এলিজাবেথ— বড় ছেলে চার্লস হ'ন 'যুবরাজ'।
৩। 'যুবরাজ' পদে চার্লস ছিলেন ৭০ বছর, ব্রিটেনের ইতিহাসে যা দীর্ঘতম ও নজিরবিহীন।
৪। মাত্র চার বছর বয়সে তাঁর সঙ্গে প্রথমবার তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আলাপ হয়। দ্বিতীয়বারের জন্য তখন ওই পদে বসেছেন উইনস্টন চার্চিল।

৫। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে চার্লসই প্রথম যিনি স্কুলে পা রেখেছিলেন। বাকিরা সবাই মুখ্যত গৃহশিক্ষকের কাছে পড়েছেন। আট বছর বয়সে চার্লস হ্যাম্পশায়ারের একটি স্কুলে ভর্তি হন। পড়াশুনোয় যদিও খুব বেশি ভাল ছিলেন না তিনি। স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলো, থিয়েটারেও নাম লেখাতেন তিনি। তবে খুব একটা সুবিধে করতে পারেননি। শোনা যায়, ১৭ বছর বয়সে তাঁর 'ম্যাকবেথ' অভিনয় দেখে ফিলিপ হেসে ফেলেছিলেন।
৬। ১৯৬৭ সালে আবারও ঐতিহ্য ভেঙে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হ'ন চার্লস। এও নজিরবিহীন। যদিও প্রবেশিকা দিতে হয়নি তাঁকে। কিন্তু ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে তিনিই প্রথম, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। দস্তুরমত কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব নিয়ে স্নাতক হ'ন।
৭। চার্লস লেখালিখি করতে বেশ ভালবাসেন। অন্তত ৩১ টি বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন।
৮। চার্লসের সঙ্গে বর্তমান রানি ক্যামিলার প্রথম আলাপ হয় ১৯৭১ সালে। প্রেম অঙ্কুরিত হলেও বেশিদূর এগোতে পারেনি, কারণ চার্লস ততদিনে রয়্যাল নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। অবশ্য শোনা যায়, এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, সম্পর্কে যুবরাজ ফিলিপের মামা চার্লসকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, 'ভবিষ্যতের রাজাকে বিবাহ কেবল একজন কুমারীই করতে পারে!' চার্লস তাঁর কথা কদ্দুর শুনতেন সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এই মামা আর কেউ নন, ভারতের শেষ ভাইসরয়, লর্ড মাউন্টব্যাটেন!

৯। ১৯৭৭ সালে তাঁর বয়স যখন ২৯, তখন তাঁর সঙ্গে প্রথম ১৬ বছরের অসামান্য সুন্দরী ডায়ানা স্পেনসারের প্রথম দেখা হয়।
১০। ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে পরিবারের চাপে চার্লসের সঙ্গে ডায়ানার বিয়ে হয়। নজিরবিহীন উন্মাদনার সাক্ষী হয় সেই বিয়ে, আজও ইতিহাসে যা অমলিন। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে হাজির ছিলেন সাড়ে তিন হাজার, কিন্তু শোভাযাত্রা দেখতে জনজোয়ার নেমেছিল ছয় লক্ষেরও বেশি লোকের। লাইভ টিভিতে তার সাক্ষী ছিল সাত কোটির বেশি মানুষ। পরের বছর, ১৯৮২ তে তাঁদের প্রথম সন্তান উইলিয়ামের জন্ম হয়।
১১। চার্লস বরাবর নানাবিধ 'অল্টারনেটিভ মেডিসিন' বা প্রথাবর্জিত চিকিৎসাবিদ্যায় বিশ্বাস রেখেছেন। যার অনেক কিছুই বিজ্ঞান স্বীকার করে না, প্রমাণও পাওয়া যায়নি। চার্লসের এ'হেন বিশ্বাসের কথা তিনি প্রথম জানিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে, ঘটনাচক্রে তখন তিনি ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।

১২। চার্লস নাকি মধ্যাহ্নভোজন করেন না।
১৩। ছবি আঁকতে চার্লস বড় ভালবাসেন। জীবনীকাররা প্রায় সকলেই চার্লসের জলরঙ করার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। যদিও সেগুলো শৈল্পিক বিচারে কতটা উঁচু মানের— সেই প্রশ্নও উঠেছে।
১৪। গোটা ৯০'-এর দশক জুড়েই চার্লসের ব্যক্তিগত জীবনে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। ক্যামিলার সঙ্গে তাঁর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়, ডায়ানার সঙ্গে তাঁর অশান্তি চরমে পৌঁছয়, মানসিকভাবে প্রবল দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯৯৫ সালে মার্টিন বশিরকে দেওয়া ডায়ানার বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারের পরে রানি দু'জনকে বিবাহবিচ্ছেদের কথা চিন্তা করতে বলেন। ১৯৯৬ সালে সেই ডিভোর্সে ডায়ানা প্রায় ১৭ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং-এর প্রাপক হ'ন, আজকের দিনে যার অর্থমূল্য প্রায় ৪১ মিলিয়ন পাউন্ড।

১৫। নিজের আত্মজীবনীতে রাজকুমার হ্যারি লিখেছেন, তাঁর ছোটবেলায় চার্লস নাকি প্রতিদিন খাটের ওপর শীর্ষাসন করতেন।
১৬। চার্লসের প্রিয় সুগন্ধীর নাম উ স্যাভয়ঁ।
১৭। ২০০৫ সালে শেষ পর্যন্ত চার্লস ক্যামিলাকে বিবাহ করেন।
১৮। চার্লসের নিজস্ব সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় দুশো কোটি পাউন্ড স্টার্লিং।

১৯। সেনাবাহিনীতে থাকার সময় চার্লস উত্তমরূপে যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টার চালানোর দক্ষতা অর্জন করেন। পাশাপাশি, তিনি নাকি বেশ ভাল 'ডাইভার'-ও।
২০। চার্লস দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশ, দূষণ, উষ্ণায়ন সহ বিভিন্ন বিষয়ে সরব। তাঁর সম্পত্তি থেকে আয়ের এক বড় অংশ তিনি দান করেন বিভিন্ন সেবামূলক কাজে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা অভিভাবকত্বে চালিত চ্যারিটির সংখ্যা প্রায় কুড়িটি, বলছেন রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠরা। রাজা হ'বার পরেও দেশবাসীকে এক বক্তৃতায় জানিয়েছেন, এখন এই নতুন দায়িত্বের চাপে তাঁর প্রিয় 'চ্যারিটিতে' তিনি বেশি সময় দিতে পারবেন না— এই একটা আক্ষেপ রয়ে গেল।
লন্ডনে রাজা তৃতীয় চার্লসের রাজ্যাভিষেকের তোড়জোড়, ভারতের প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন ধনখড়