
শেষ আপডেট: 6 August 2019 18:30
কচুরিপানা থেকে স্যানিটারি প্যাড— এই ভাবনাটা অনেক দিনের। প্রজেক্টের মেনটর সরথ কে এস জানিয়েছেন, পুকুরে, জলাশয়ে মানুষের মাথাব্যথার কারণ এই কচুরিপানা। প্রায় ২ মিটার ঘন স্তর তৈরি করে ঢেকে ফেলতে পারে একটা গোটা পুকুর বা জলাশয়কে। গ্রামে, শহরে এই কচুরিপানা সাফাই অভিযানে রীতিমতো কোমর কষে নেমেছে স্থানীয় প্রশাসন। কাজ করছে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও। সরথের কথায়, “Water hyacinth বা কচুরিপানা তুলে তো ফেলেই দেওয়া হয়। অনেকেই জানে না এই আগাছার অনেক গুণও রয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত উপায় একে পরিশোধিত করতে পারলে মানুষের প্রয়োজনে লাগানো সম্ভব। সেই থেকেই কচুরিপানা ব্যবহার করে স্যানিটারি ন্যাপকিন বানানোর ভাবনা আমাদের মাথায় আসে।”
কী ভাবে কচুরিপানা থেকে বায়োডিগ্রেডেবল প্যাড বানানো সম্ভব হলো? সরথ জানিয়েছেন, হেন্না, আওয়াস্তি ও সৃজেশ প্রথমে এলাকার বিভিন্ন পুকুর, জলাশয় থেকে কচুরিপানা সংগ্রহের কাজ শুরু করে। তাদের দেখে এগিয়ে আসে ক্লাস টেনের অন্য পড়ুয়ারাও। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কচুরিপানা জোগাড়ের কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে যায়।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্ভে করা। মাল্লাপুরমের মারাক্কারা পঞ্চায়েত এলাকার রানদাথানি, কেজমুরি, এরক্কারার প্রতিটা বাড়িতে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলেন ছাত্রছাত্রীরা। হেন্না জানিয়েছে, তাজ্জব হওয়ার মতো ব্যাপার প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে প্রায় ৩০ শতাংশ মহিলা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারই করেন না। এখনও তাঁদের ভরসা কাপড়। বাকিদের ৯৭ শতাংশ প্লাস্টিক উপাদানে তৈরি প্যাড ব্যবহার করেন। ব্যবহার করা প্যাডও ফেলে দেওয়া হয় যত্রতত্র। সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ মহিলা ব্যবহারের পরে প্যাড পুড়িয়ে দেন, অন্তত ১১ শতাংশ ফ্লাশ করে দেন।
তৃতীয় পদক্ষেপ ছিল কচুরিপানা পরিষ্কার করে বিজ্ঞানসম্মত উপায় সেগুলিতে পরিশোধিত করা। তার জন্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে পড়ুয়ারা। পরিশোধিত কচুরিপানার উপর তুলো ও আনুষঙ্গিক জিনিস দিয়ে তৈরি হয় অ্যাবসরবেন্ট লেয়ার। এর পর আলট্রাভায়োলেট স্টেরিলাইজেশনের মাধ্যমে সেগুলিকে বিশুদ্ধ ও জীবাণু মুক্ত করা হয়।
পড়ুয়াদের কথায়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এই প্যাড বাজার চলতি নামী প্যাডের থেকে ১২ গুণ বেশি ঋতুস্রাবের রক্ত শুষে নিতে পারে। ত্বকের জন্যও স্বাস্থ্যকর। গ্রামীণ এলাকার মহিলাদের কথা ভেবে এর দামও রাখা হয়েছে সাধ্যের মধ্যেই। এক একটি প্যাডের দাম ৩ টাকা করে। পড়ুয়াদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে কেরল সরকারও। রাজ্য সরকারের ‘ইয়ং ইনোভেটরস প্রোগ্রাম (YIP)’-এ সেরার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তাদের।
২০০৪ সালে তামিলনাড়ুর কোয়ম্বত্তূরে প্রথম স্যানিটারি প্যাড তৈরির যন্ত্রটি যখন আবিষ্কার করেন অরুণাচলম মুরুগনন্তম, তাঁর উপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সংস্কারপন্থী সমাজ। মহিলাদের ঋতুস্রাব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন একজন পুরুষ, প্রকাশ্যে তৈরি করছেন প্যাড, এ কি রকম অনাসৃষ্টি কাণ্ড! বাধা যতই আসুক, ছিছিক্কার যতই বাড়ুক, মুরুগনন্তম জানতেন একদিন এই কাজে এগিয়ে আসবে বৃহত্তর সমাজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তাঁর ধারণা যে অমূলক ছিল না তার প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে বর্তমান সমাজেই। ঋতুস্রাব এবং মহিলাদের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সার্বিক স্তরে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে এসেছেন মহিলারাও।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (আইআইটি) দু‘জন ছাত্রী দেবযানী মালাডকার এবং ঐশ্বর্য আগরওয়াল বানিয়ে ফেলেছেন এমন একটি যন্ত্র যার মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত উপায় ব্যবহার করা স্যানিটারি প্যাড ধুয়ে মুছে, ফের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা যায়। তাঁদের এই যন্ত্রের নাম “Cleanse right”। এর আগে চেন্নাইয়ের আন্না ইউনিভার্সিটির পিএইচডি স্কলার ‘প্যাড ওম্যান’ প্রীতি রামাডোস ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ স্যানিটারি ন্যাপকিন বানিয়ে চমকে দিয়েছিলেন। বায়োডিগ্রেডেবল সেই প্যাড তৈরি হয়েছিল প্লাস্টিক জাতীয় উপাদান ছাড়াই। প্রীতি জানিয়েছিলেন, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদার্থ যেমন পলিস্যাকারাইড এবং পলিমার দিয়ে তৈরি হয়েছে তাঁর স্যানিটারি ন্যাপকিন।
আরও পড়ুন:
https://www.four.suk.1wp.in/news-iit-girls-make-affordable-device-to-clean-sanitary-napkins-and-reduce-biomedical-waste/