দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৬৪ সাল। লন্ডনের সেন্ট থমাস হসপিটাল মেডিক্যাল স্কুলে তখন ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছেন জুন আলমেইডা। বয়স ৩৪ বছর। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ভাইরাসের গঠন পর্যবেক্ষণ করে তার একটা ইমেজ বা ছবি বানানোই কাজ আলমেইডার। এই সেন্ট টমাস মেডিক্যাল স্কুলই এখন কিংস কলেজ লন্ডনের একটি অংশ। করোনার সংক্রমণ নিয়ে এখানেই ভর্তি ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।
ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে সেবার হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন ভাইরোলজিস্ট জুন আলমেইডা। জ্বর-সর্দিকাশিতে ভোগা কিছু রোগীর নাক থেকে নেওয়া নমুনায় এমন ভাইরাস রয়েছে যা আগে কেউ দেখেনি। এর গঠনও ভারি অদ্ভুত। গোলাকার, ফাঁপা মতো ভাইরাস, যার চারদিকে যেন কাঁটার মুকুট রয়েছে। এমন ভাইরাসের ছবি বের করে সকলের সামনে তুলে ধরলেন আলমেইডা।
হিউম্যান করোনাভাইরাস, মানুষের শরীরে পাওয়া প্রথম করোনাভাইরাস যার কথা সেই ১৯৬৪ সালেই বলে গিয়েছিলেন ভাইরোলজিস্ট জুন আলমেইডা। ‘ক্রাউন’ বা মুকুটের মতো গঠন বলে ‘করোনা’—এই নামও জুন আলমেইডা ও তাঁর টিমের সদস্যদেরই দেওয়া। এই গবেষণা তখন স্বীকৃতি পায়নি। চারদিকে কাঁটার মতো দেখতে এমন ভাইরাসের কথা খুব একটা জোর দিয়ে কেউ বিশ্বাস করতে চাননি। তাবড় বিজ্ঞানীমহলে করোনাভাইরাসের খোঁজ তখন এক মামুলি হিসেবেই থেকে গিয়েছিল। সেই করোনাই এখন অতিমহামারী গোটা বিশ্বে। মানুষের টনক নড়েছে ৫৬ বছর পরে। সঙ্কটের সময় দাঁড়িয়ে জুন আলমেইডার গবেষণাই এখন চর্চার বিষয়। কীভাবে এই ভাইরাসের খোঁজ পেয়েছিলেন আলমেইডা সেটাই বলেছেন মেডিক্যাল জার্নালের লেখক জর্জ উইনটার।
অভাবে ছেড়েছিলেন স্কুল, নামী কলেজের ডিগ্রিও ছিল না, মেধাবী জুনই পরে হয়ে ওঠেন ভাইরোলজিস্ট
জুন ড্যালজেইল হার্ট। ১৯৩০ সালে জন্ম স্কটল্যান্ডে। গ্লাসগোর ডানট্রন স্ট্রিটে। বয়স যখন ১৬ বছর, স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন জুন হার্ট। বাবা ছিলেন পেশায় বাসচালক। অভাবের সংসারে পড়াশোনার থেকে চাকরিটাই আগে দরকার ছিল। উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা থাকলেও সেটা পূরণ হয়নি। স্কুল ছেড়ে চাকরির খোঁজ করতে করতে গ্লাসগো রয়্যাল ইনফার্মারিতে হিস্টোপ্যাথোলজি টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন তিনি। বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন, তাই প্রশিক্ষণ নিতে বেশি সময় লাগেনি। সেটা ১৯৪৭ সাল। তারপরে সেন্ট বার্থোলোমেউ হাসপাতালে প্যাথোলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। এরপরে ফিরে আসেন লন্ডনে। ভেনেজুয়েলার একজন চিত্রশিল্পী এনরিকে আলমেইডার সঙ্গে প্রেম, তারপর বিয়ে।
কানাডার ক্যানসার ইনস্টিটিউটে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শুরু
জর্জ উইনটার বলেছেন, সে সময় ব্রিটেনের মতো কানাডায় শিক্ষা বা গবেষণার ক্ষেত্রে অত কড়াকড়ি ছিল না। নামী কলেজ বা ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি না থাকলেও গবেষণার কাজে যোগ দেওয়া যেত। সেই কারণে সুবিধাই হয়েছিল জুন আলমেইডার। ওন্টারিওর ক্যানসার ইনস্টিটিউটে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন জুন। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নীচে কীভাবে ভাইরাসের গঠন পুরোপুরি ধরা পড়বে তার নতুন পদ্ধতিও বের করেছিলেন তিনি। গোটা কানাডায় তাঁর মেধা ও দক্ষতার কথা ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর গবেষণা বিজ্ঞান পত্রিকায় ছাপা হতে শুরু করে। ১৯৬৩ সালে তিনজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে জুন আলমেইডার নামও ওঠে ‘সায়েন্স’ জার্নালে। যেখানে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর রক্তে একরকম সংক্রামক জীবাণুকে চিহ্নিত করেছিলেন জুন।
কানাডা থেকে ফিরলেন লন্ডনে, ইতিহাস তৈরি হল সেন্ট টমাস মেডিক্যাল স্কুলে
১৯৬৪ সাল। কানাডা থেকে আবার লন্ডনে ফিরলেন জন আলমেইডা। সঙ্গে স্বামী, মেয়ে। লন্ডনের পুরনো ও ঐতিহ্যশালী সেন্ট টমাস হসপিটাল মেডিক্যাল স্কুলের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ভাইরোলজিস্ট হিসেবে গবেষণা শুরু করলেন। ওই বিভাগের প্রধান তখন টোনি ওয়াটারসন। কানাডাতেই জুন আলমেইডার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর। জুনের মেধা দেখে বিস্মিত টোনি তাঁকে নিজের ল্যাবেই গবেষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। টোনি ওয়াটারসন ও জুন আলমেইডা ভাইরাসের গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন।
১৯৬৬ সাল। জুন তখন গবেষণা করছেন হেপাটাইটিস বি ও কোল্ড ভাইরাস নিয়ে। টোনি ও জুনের টিমে যোগ দেন ডাক্তার ডেভিড টাইরেল। ডেভিড সেই সময় স্যালিসবারির কোল্ড ইউনিটে ফ্লু নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনজনে মিলে নতুন অর্গ্যান কালচার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁদের বিষয় ছিল কোষের মধ্যে রাইনোভাইরাসকে চিহ্নিত করা। টিস্যু কালচার ল্যাবে এই ধরনের ভাইরাস নিয়ে কাজ করতে করতেই একদিন নতুন একরকম ভাইরাসের খোঁজ পেলেন ডেভিড ও জুন আলমেইডা।

জ্বরে আক্রান্ত এক স্কুল ছাত্রের নাক থেকে নেওয়া নমুনার মধ্যে একধরনের অজানা জীবাণুর খোঁজ পেলেন ডাক্তার ডেভিড টাইরেল। সেই ভাইরাল স্ট্রেনের নাম দেওয়া হয় বি৮১৪। ডেভিড ও জুন দেখলেন, অন্যান্য রেসপিরেটারি ভাইরাল স্ট্রেনের থেকে এটি অনেক আলাদা। তাকে ল্যাবে কালচার করা সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে কেমন এই জীবাণু? ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নীচে বিশেষ উপায়ে এই ভাইরাসের চেহারা দেখালেন জুন আলমেইডা। গোলাকার গঠন, তার চারপাশে কাঁটার মতো অংশ সাজানো। ভাইরাসের ইমেজও বার করলেন জুন। নাম হল করোনাভাইরাস।

মানুষের শরীরে প্রথম এই ধরনের ভাইরাসের খোঁজ পাওয়া গেছে বলে ‘সায়েন্স’ জার্নালে গবেষণার রিপোর্টও বের করলেন জুন আলমেইডা, টোনি ওয়াটারসন ও ডেভিড টাইরেল। কিন্তু এই গবেষণাপত্রকে নাকচ করে দিল তাবড় বিজ্ঞানীমহল। জানানো হল, চারপাশে কাঁটার মতো আকৃতির এমন ভাইরাস হতেই পারে না। ভাইরাসের ছবিও নাকি ভাল আসেনি। করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা একপ্রকার বাধ্য হয়েই থামিয়ে দিতে হল জুন আলমেইডাকে।
গবেষণা স্বীকৃতি পেল না ঠিকই, তবে ভাইরাস নিয়ে চর্চায় তাঁর মেধাকে সম্মানিত করল লন্ডনের মেডিক্যাল স্কুল। জুন আলমেইডাকে দেওয়া হল। এরপরে ওয়েলকাম ইনস্টিটিউটে ভাইরাস নিয়ে অনেক গবেষণা করেন জুন। ভাইরাস ইমেজের অনেক পেটেন্ট আছে তাঁর নামে।
শেষ জীবনে যোগ প্রশিক্ষক হয়েছিলেন জুন। তবে ১৯৮০ সালের পরে অনেক ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটেই বিশেষ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হয়ে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে ভাইরাস চিহ্নিতকরণের কাজ করেছেন। ভাইরোলজির অনেক গবেষণাপত্র ও বইয়ে তাঁর ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে বের করা ভাইরাসের ইমেজ ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০৭ সালে ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তাঁর।