
শেষ আপডেট: 12 November 2023 16:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো, ঝাড়গ্রাম: বাংলার জেলায় জেলায় বিভিন্ন কালী মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে বহু ইতিহাস। সেইরকমই এক অলৌকিক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে, ঝাড়গ্রামের সেবায়তনে কেঁউদি যোগমায়া মন্দির, আবার অনেকের কাছে উত্তরেশ্বর কালী মন্দির।
প্রায় ৭৪ বছর ধরে দাস পরিবারের মন্দিরে পূজিতা দেবী যোগমায়া। ঝাড়গ্রাম গ্রামীণ ব্লকের রাধানগর অঞ্চলের সেবায়তন এলাকায় লাগোয়া ছোট্ট গ্রাম কেঁউদি। সেই গ্রামের পথ পেরিয়ে কিছুটা গেলেই বাঁশ গাছের জঙ্গলে দেবীর মন্দির। এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনি। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হাড়িরাম দাস, তিনি তন্ত্রসিদ্ধ হয়ে স্বপ্নাদেশে দেবীকে কন্যারূপে পেয়েছিলেন।
সময়টা চল্লিশের দশক। কথিত রয়েছে, হাড়িরামের ঘর আলো করে এসেছিল ফুটফুটে এক মেয়ে। কিন্তু মাত্র দেড় বছরে অসুস্থ হয়ে রক্তবমি করে মৃত্যু হয় সেই শিশুকন্যার। মেয়েকে হারিয়ে উন্মাদের মতো হয়ে যান হাড়িরাম। গ্রামের অদূরে শ্মশানের মাটি চাপা দিয়ে সমাহিত করেন মেয়েকে। কিন্তু সন্তানহারা বাবার মন সর্বক্ষণই মেয়ের জন্য কেঁদে উঠত। রাত হলেই শ্মশানে গিয়ে মাটি সরিয়ে মেয়ের দেহ বুকে চেপে কান্নায় ভেঙে পড়তেন তিনি। ভোরের আলো ফোটার আগে ফের মেয়ের দেহ মাটিচাপা দিয়ে আসতেন। এভাবে চলতে থাকে চারদিন। পঞ্চম দিনে শ্মশানে দেবী যোগমায়ার দর্শন পেলেন হাড়িরাম। দেবী জানালেন, এভাবে মাটি সরিয়ে রোজ মেয়ের দেহ দেখতে আসার দরকার নেই। তিনিই কন্যারূপে হাড়িরামের বাড়িতে থাকবেন আজীবন।
হাড়িরাম অব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব। কিন্তু দেবীর আদেশে বাড়ির উঠোনে বেলগাছের তলায় পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা শুরু করলেন তিনি। সঙ্গী হিসেবে পেলেন বহিরাগত তিন তান্ত্রিককে। এক অমাবস্যায় সিদ্ধিলাভ হল।
এরপরই ১৯৪৯ সালের এক অমাবস্যায় মাটির দেওয়াল ও খড়ের চালাঘরে যোগমায়াকে প্রতিষ্ঠা করেন হাড়িরাম। ‘হরি কৃষ্ণ হরি রাম, কালী কৃষ্ণ রাম রাম’ মন্ত্রে দেবীর পুজো করতেন হাড়িরাম। ধীরে ধীরে দেবীর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। ভক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকল। তৈরি হল দেবীর সুদৃশ্য মন্দির। হাড়িরামের সঙ্গে দেবীর সেবা করতে শুরু করলেন তাঁর স্ত্রী মনোরমাও। ক্রমে হাড়িরামের মাথায় প্রকাণ্ড জটা তৈরি হয়। মৃত্যুর আগে তিনি সেই জটা কেটে মন্দিরে রেখে দেন, যা আজও দেবীমূর্তির পাশে একটি কাচ ঘেরা কাঠের বাক্সে রাখা আছে।
বর্তমানে মন্দিরের সেবাইতের দায়িত্বে রয়েছেন হাড়িরামের ছেলে শিশির দাস। বছর আটষট্টির শিশিরবাবু জানিয়েছেন, বাবার মৃত্যুর পর তিনিই রোজ দেবীর নিত্যসেবা করছেন। এখনও দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন। হাড়িরামের মৃত্যুর পর মন্দিরের পাশেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। পরে তাঁর স্ত্রী মনোরমার মৃত্যু হলে তাঁকেও হাড়িরামের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। ভক্তদের দানে সেখানে তৈরি হয়েছে সমাধি মন্দির। মন্দিরে মায়ের বিগ্রহের পাশেই রয়েছে হাড়িরামের মূর্তিও। দেবীর পুরনো মাটির মূর্তি প্রতি বছর নবকলেবর ধারণ করে।
কালীপুজোর রাতে এখানে প্রচুর ভক্ত আসেন। রাত দু'টোর অমানিশায় পুজো হয়। শিশিরবাবুর কথায়, 'মা আমাদের ঘরের মেয়ে। ভক্তিভরে মায়ের কাছে প্রার্থনা জানালে, মা ভক্তের কথা শোনেন। সেই বিশ্বাসেই বহু মানুষ আসেন।'