
শেষ আপডেট: 29 May 2023 05:30

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট (Everest) জয়ের সত্তর বছর পূর্ণ হল। স্যার এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগের সেই এভারেস্ট বিজয়ের আগে পরে ‘হাজার বছর ধরে’ পৃথিবীর পথে হেঁটে হেঁটে মানুষ জয় করেছে নানা পর্বতশৃঙ্গে। হৃদয়ের ক্ষুধা আর অন্তরের অতৃপ্তির কারণে ভ্রমণবিলাসী কতশত মানুষই না গৃহ প্রাচীরের আবেষ্টনী থেকে মুক্ত হয়ে সুদূর প্রকৃতির অনন্ত আহবানে সাড়া দিয়েছে। তাদেরই একটি চিরবিস্ময় এভারেস্ট! আজ ইতিহাস ও ভূগোলের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। সারা বিশ্বে এই দিনটি এভারেস্ট দিবস (International Mount Everest Day) বা তেনজিং-এর জন্মদিন। তেনজিং তাঁর জন্মদিন ঠিকমতো না জানার ফলে এডমন্ড হিলারি ২৯ মে দিনটিকেই তাঁর জন্মদিন হিসাবে কাগজে কলমে নথিভুক্ত করেন!
তুষারাবৃত হিমালয়ের আকর্ষণে বার বার আমার হিমালয়ের (Mount Everest) কাছাকাছি দার্জিলিং যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে কখনো বাগোরা, কখনো লেপচাজগত, কখনো ঘুম, কখনো কার্শিয়াং, কখনো লামাহাটা। প্রতিবার গলা উঁচু করে ভোরে দেখার চেষ্টা করেছি কাঞ্চনজঙ্ঘা। সমতলের বাঙালি আমি, অনভ্যস্ত শরীর নিয়ে পাহাড় চড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি, শুধু ওপরে উঠলে তো হবে না! আমাদের চারপাশে অনেককে পিছনে ফেলে, ‘শর্ট কাট’ রাস্তায় ওপরে ওঠার বহু বিকল্প পথ চালু হয়েছে এখন। পশ্চিমবঙ্গের সিনিয়র সাংবাদিক শুভঙ্কর মুখোপাধ্যায় সম্প্রতি লিখেছেন, এভারেস্টে প্রথম পা দিয়েছিলেন কে, তেনজিং না এডমণ্ড হিলারি? কোনও ছবি নেই।
তেনজিংয়ের দুই খণ্ডের আত্মজীবনী ‘টাইগার অব স্নোজ’ আর ‘ম্যান অব এভারেস্ট’ কিংবা হিলারির আত্মকথা ‘নাথিং ভেঞ্চার, নাথিং উইন’ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও পাওয়া যায়নি যে, কে ছিলেন সেদিনের ‘ফার্স্ট বয়’! কেন? কেন এমন ছবিহীন নির্বাক রূপকথা? কারণ তখনও এই নার্সিসিস্ট সেলফির যুগ শুরু হয়নি। তেনজিং বা হিলারির কাছে পাহাড়ে ওঠাটা ‘কেরিয়ার’ ছিল না, ছিল ‘ক্রিয়েশন’। আর ‘ক্রিয়েশন’-এর কোনও ‘কম্পিটিশন’ হয় না। সেটা এখনের জাহিরবাদী দুনিয়ার ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ দিয়ে বোঝা যাবে না। তেনজিং লিখেছেন, ‘আমরা’ এভারেস্ট জয় করেছিলাম। হিলারির বর্ণনা, ‘আমরা’ এভারেস্টে পৌঁছেছিলাম।

২৯ মে, ১৯৫৩, সকাল সাড়ে এগারোটা। এভারেস্টের শীর্ষে উঠে তেনজিং আর হিলারি তখন হতবাক হয়ে দেখছেন, রুপোলি বরফরানির শিরে সোনার মুকুটের মতো তাজা রোদ্দুর। সমুদ্রনীল আকাশে একটু সেকটু সাদা মেঘ, যেন বরফের ছায়ানৃত্য। পাখপাখালি নেই, গাছগাছালি নেই। শুধুই মহাশূন্য, আর শূন্যের ভিতরে অজস্র ঢেউ। আর অনেক নীচে, পৃথিবী নামক গ্লোবটা যেন ছোট্ট একটা টেনিস বল।
কাঁটাতারের মতো দেখতে একটা নেটের এপারে ওপারে সে ক্রমাগত গোত্তা খাচ্ছে! ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের বিচারে এভারেস্টের চূড়ায় তেনজিং-হিলারির ওই ‘১৫ মিনিট’ বিংশ শতকের একশ’টি প্রভাবশালী ঘটনার অন্যতম। তেনজিংয়ের ছেলে জামলিং ‘মাই ফাদারস সোল’ বইয়ে লিখেছেন যে, বাবার কাছে ক্যামেরাই ছিল না। হিলারির কাছে ছিল। বাবা বলেছিল, ক্যামেরটা দাও সাহেব। অন্তত তোমার একটা ছবি তুলে দিই। হিলারি বলেছিলেন, না তেন, আমাদের দু’জনের ছবি তোলার মতো কেউ যখন এখানে নেই, তখন শুধু একজনের ছবি তুলে কী হবে!
‘ভাবুক আর ভ্রমণকারী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দরবেশ’-ভ্রমণকামী মানুষের প্রতি কবি শেখ সাদীর সেই উক্তিটি তাই আজ চরম সত্য বলে মনে হয়। চলতি মে মাস জুড়ে এভারেস্টের চূড়ায় ছিল পতাকা উড়ানোর মৌসুম। বিজয়পদচিহ্ন আঁকার মৌসুম। সমতল থেকে যে উচ্চতাপানে ধাবিত হয়েছিলেন পাহাড়প্রেমীরা,বিজয়ীবেশে তারা মে মাসজুড়ে নেমে এসেছেন ধীর পায়ে।
দশ বছর আগে এরকম দিনে ভারতের প্রথম প্রতিবন্ধী মহিলা হিসেবে এভারেস্ট ছোঁয়ার কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন অরুণিমা সিংহ। প্রতিবন্ধী মানবী অরুনিমা দুর্ল্যঙ্ঘ এভারেস্ট জয় ভারতজুড়ে সৃষ্টি করেছে নতুন এক নজির। এরকম ইতিহাস ঘাটলে বেরিয়ে আসবে সমাজের নিচুতলার ছন্দা-অরুনিমা আর টুসির এভারেস্ট জয়ের বিচিত্র ঘটনা। এমন গল্পও আছে যেখানে বয়স বাধ সাধেনি এভারেস্ট বিজয়ে। আশি বছর বয়সে মানুষের যখন নাতি-পুতির সাথে ঘরে বসে সময় কাটানোর কথা তখন জাপানের উইচিরো মিউরাও জয় করলেন এভারেস্ট। চার বার হার্ট-অপারেশনের উইচিরো সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ হিসেবে এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন দশ বছর আগে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য এই যে, শারীরিকভাবে কিছুটা সংশয়ী, আর্থিকভাবে পর্যুদস্ত কিংবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই পর্বতারোহীরা প্রত্যেকেই গোপন স্বপ্নের মতোই লালন করেছেন এভারেস্টে চড়ার স্বপ্ন। তাই পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতাকে টপকানোর মাধ্যমে তারা টপকে যেতে পেরেছেন সুউচ্চ দাম্ভিক মাউন্ট এভারেস্টকে।
এভারেস্ট বিজয়ের খবর যারা নিয়মিত রাখেন, তারা জানেন, এরকম বহু বিচিত্র গল্প আছে এভারেস্ট চড়ার পেছেনে। তেমনি আছে বহু কষ্টের গল্পও। এভারেস্ট যাত্রা অনেক সময় পরিণত হয়েছে বরফ চাপা কষ্টে। হিমালয়ের উত্তুরে বাতাস বাংলাদেশে বয়ে এনেছিলো এক চরম দুঃসংবাদ-‘এভারেস্ট জয় করে ফেরার পথে বাংলাদেশি অভিযাত্রির মৃত্যু’। হ্যাঁ! অন্য সবার মতো সেদিন আরও এক সফল অভিযাত্রী হিসেবে সজলের পা পড়েছিল এভারেস্টের শীর্ষে। কিন্তু সেই সাফল্যের সমাপ্তি অরুণিমা,ছন্দাদের থেকে পুরোটাই আলাদা। এভারেস্ট ছুঁয়েও ঘরে ফেরা হল না বাংলাদেশের সজল খালেদের। সজল পঞ্চম এভারেস্ট বিজয়ী বাংলাদেশি। একই দিন বিনা অক্সিজেনে এভারেস্টকে পদানত করার পণ করে সজলের সাথে ধু ধু বরফে নিথর পড়ে রইলেন কোরিয়ার সাং হো সিউ।
আমাদের রাজনৈতিক-সামাজিক-ব্যক্তিগত জীবনের বিচিত্র,অসম্ভব, দুর্ল্যঙ্ঘ সব সংকট মোকাবেলায় এই এভারেস্ট বিজয়ীরাই দারুণ প্রেরণা। জীবনে চলার পথে এমন অবাক করে দেয়া মনের জোর-ই তো চাই। চাই আত্মবিশ্বাস!
‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি’ বলে যে মানুষটি এভারেস্টের পথে পা বাড়ায়, তার পদে পদে আছে মৃত্যুর শীতল হাতছানি। আছে মনোবল হারানোর ভয়। অপরিচিত আবহাওয়ায় ‘যমে-মানুষের টানাটানি’ শেষে বেস-ক্যাম্পে পৌঁছনো। আর এদিকে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায় এভারেস্ট যাত্রীর দারা-পুত্র-পরিবার। এভারেস্টে পা রাখার পর মনে হয়,যেন চাঁদে পৌঁছানোর খবর ভেসে এলো। নয়তো এভারেস্টের বুকে রচিত হয় আরো একটি মৃত্যু আলিঙ্গন। অত উচ্চতায় যার মৃত্যু,তাকে অনেক সময় নামিয়ে আনাও সম্ভব হয় না। যুগে যুগে তবুও অব্যাহত থাকে এভারেস্ট অভিমুখে মিছিল।
এভারেস্ট জয়ের ব্যক্তিগত অর্জনগুলো থেকে এবার চোখ ফেরানো যাক সামাজিক পরিসরে। বাংলাদেশ এখন দারুণ এক সময় পার করছে। ক্ষমতায় টিকে থাকা আর ক্ষমতায় যাওয়ার নানা কলাকৌশল নিয়ে দেশের দুটি দল সমীকরণ মেলাচ্ছে। আমরা যেন প্রায়শ ভুলে যাই, নিয়মবদ্ধ শৃঙ্খলাতেই চূড়ায় উঠতে হয়। আমরা মনে করি, ক্ষমতাই নিয়মের জনক। আমরা মানি না-চূড়া থেকে বিজয়ী বেশে ফিরে আসার নিয়ম। আমরা খুঁজি শর্টকাট পথ। রাজনীতির পাহাড়ে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি না- অসাবধানতা আর ঝঞ্ঝাক্ষুদ্ধ প্রতিকূল পরিবেশে চূড়াতেই থেকে যেতে হয় ‘ইতিহাস’ হয়ে। চূড়ায় ওঠা এবং নামার এই যে ‘নিয়ম’ তা তো মানতেই হবে। এর অন্যথা নাই। পাহাড়বিজয়ীদের কাছ থেকে কবে শিক্ষা নিবেন আমাদের রাজনীতিকরা? শৃঙ্খলায় উপরে উঠা আর ধৈর্য্যের সাথে নিচে নামে; এই হোক পর্বত কিংবা ক্ষমতারোহনের অন্যতম শিক্ষা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
আরও পড়ুন: ঐতিহাসিক জয়! টানা তৃতীয়বারের জন্য তুরস্কের কুরশিতে এরদোগান