দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশে করোনা পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে হাজারের বেশি ল্যাবরেটরিতে কোভিড টেস্ট হচ্ছে। কিন্তু সংক্রমণ ছড়ানোর হার তেমনভাবে কমছে না। চেন্নাইয়ের ইনস্টিটিউট অব ম্যাথেমেটিক্যাল সায়েন্সের গবেষকরা বলছেন, ‘আর নম্বর’ তথা এফেকটিভ রিপ্রোডাকশন নম্বর ১.১৭ পয়েন্টেই থেমে গেছে। মাঝে একবার এই নম্বর কিছুটা কমে পৌঁছেছিল ১.১১ পয়েন্টে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে আর নম্বরের কোনও বদল হয়নি। এই নম্বর যদি একের নীচে না নামে তাহলে করোনা সংক্রমণের হার বাড়ার সম্ভাবনা আছে। তবে আতঙ্কের কারণ নেই, আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করা গেলে রোগ সারানোও সম্ভব বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
ইনস্টিটিউট অব ম্যাথেমেটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক সীতাভ্র সিনহা বলেছেন, এই আর নম্বর হল এমন একটা গাণিতিক হিসেব যার দ্বারা সংক্রমণের হার মাপা হয়। একজন করোনা রোগীর থেকে কতজনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে সেটা মাপা হয় আর নম্বর দিয়ে। এই হিসেবের মাপকাঠিতেই নির্ণয় করা হয় সংক্রমণ কতটা ছড়িয়ে পড়ল এবং কতজনের মধ্যে ছড়াল। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণের হার বা কোভিড ট্রান্সমিশন রেটের সঙ্গে এই আর নম্বরের সম্পর্ক রয়েছে। শুরুতে এই সংক্রমণের হার মাপার জন্য রিপ্রোডাকশন নম্বর তথা ‘আর-নট’ স্কেলের হিসেব প্রয়োগ করছিল ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)। ১.৫ থেকে ৪.০ মাত্রার সেই স্কেল কম থেকে যত বেশির দিকে যাবে, সংক্রমণ বৃদ্ধির হার ততটাই বাড়বে। রিপ্রোডাকশন নম্বরের স্কেল যদি ২.৫ থেকে শুরু করা যায়, তাহলে দেখা যাবে একজন সংক্রামিত সামাজিক দূরত্বের বিধি না মানলে ৩০ দিনে ৪০৬ জনকে আক্রান্ত করতে পারবেন। এই হিসেবই এখন আর নম্বর (R)দিয়ে মাপা হচ্ছে।
গবেষক জানিয়েছেন, গত ২৬ জুন দেশে আর নম্বর ছিল ১.১১, এরপরে ৭ জুলাই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১.১৯ পয়েন্টে। ১৩ জুলাই ফের দেখা যায় আর নম্বর কমে গেছে ১.১১ পয়েন্টে। সেই সময় আশা জাগে সংক্রমণের হার কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু ফের ২০ জুলাই গিয়ে দেখা যায় এই নম্বর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.১৭ পয়েন্টে। গবেষকের বক্তব্য, দ্বিতীয় আনলক পর্যায় থেকেই এই আর নম্বর বাড়তে শুরু করে। হিসেব দিয়ে তিনি দেখান, লকডাউন শুরু আগে গত ৪ মার্চ দেশের আর নম্বর ছিল ১.৮৩। ওই সময় উহানের আর নম্বর ছিল ২.১৪ এবং ইতালির ২.৭৩, যা ভারতের থেকে অনেক বেশি। অর্থাৎ সংক্রমণ ছড়ানোর হার বেশি। ভারতে ২৫ মার্চ থেকে লকডাউন শুরু হওয়ার পরে এই নম্বর কমতে থাকে। ৬ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত আর নম্বর নেমে আসে ১.৫৫ পয়েন্টে। জুনের প্রথমে সেটাই পৌঁছয় ১.৪৯ পয়েন্টে। আর নম্বরের এই ধারাবাহিক পতন দেখেই লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আনলক শুরুর পরেই জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই ফের আর নম্বর বেড়ে পৌঁছে যায় ১.১৯ পয়েন্টে।
গবেষক সীতাভ্র সিনহা বলেছেন, দিল্লিতে একসময় সংক্রমণ বৃদ্ধির হার বেশি হলেও এখন আর নম্বর কমেছে ০.৬৮ পয়েন্টে। গত ১৫ দিন ধরেই রাজধানীতে আর নম্বর কম। তাই আশা করা যাচ্ছে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
অন্যদিকে, মুম্বই ও চেন্নাইতে আর নম্বর একের কাছাকাছি চলে এসেছে। বিশেষত ধারাভি বস্তিতে সংক্রমণের হার কমায় আশা জেগেছে। সেখানে রিকভারি রেট বা সুস্থতার হার বেড়েছে। কমট্যাক্ট ট্রেসিংয়ে আক্রান্ত রোগীদের কাছাকাছি আসাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে।
কর্নাটকে আর নম্বর এখনও বেশি। বেঙ্গালুরুতে আর নম্বর এই সপ্তাহে ১.৪০ পয়েন্ট। তেলঙ্গানায় ১.৬৫, অন্ধ্রপ্রদেশে ১.৩২। এই তিন রাজ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি হচ্ছে দ্রুত হারে।
এই ‘আর’ নম্বর তিনটি ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, একজন করোনা পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমণ ছড়াবার ঝুঁকি কতটা, দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত ও সংক্রমণের সন্দেহে থাকা ব্যক্তিরা কতজনের সংস্পর্শে আসছেন তার গড় হিসেব, তৃতীয়ত, একজনের থেকে সংক্রমণ কতজনের মধ্যে ছড়াচ্ছে এবং কতদিনে, সেই হিসেব। এই আর নম্বর যেদিন একের নীচে নেমে যাবে সংক্রমণ বৃদ্ধির হারও এক ধাক্কায় কমে যাবে।