মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেই যদি তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তবে সেই রাজ্যের কাছেই কি প্রতিকার চাইতে পারে তদন্তকারী সংস্থা - এটাই রাজ্যের আইনজীবীদের থেকে জানতে চায় আদালত।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক মনু সিংভি এবং কপিল সিবাল
শেষ আপডেট: 24 March 2026 18:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একজন তাঁর দলেরই নেতা, লোকসভার সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)। অন্য দু'জন রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা হলেও আইপ্যাক মামলায় (I-PAC Supreme Court Hearing) সওয়াল করছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) হয়েই। তাঁরা কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিবাল (Kapil Sibal) এবং অভিষেক মনু সিংভি (Abhisekh Manu Singvi)। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে আইপ্যাক মামলার শুনানিতে এই তিন আইনজীবী-সাংসদই তেড়েফুঁড়ে উঠলেন মমতার হয়ে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট কি সন্তুষ্ট হল তাঁদের যুক্তিতে?
আইপ্যাক মামলার শুনানিতে (I-PAC Case Hearing) মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেই যদি তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তবে সেই রাজ্যের কাছেই কি প্রতিকার চাইতে পারে তদন্তকারী সংস্থা - এটাই রাজ্যের আইনজীবীদের থেকে জানতে চায় আদালত।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিন সাংসদ-আইনজীবী নিজেদের মতো ব্যাখ্যা, যুক্তি দিতে চেষ্টা করেন সুপ্রিম কোর্টে -
কপিল সিবাল
ইডির তল্লাশি ঘিরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় রাজ্যের প্রাথমিক আপত্তির শুনানিতে এই প্রশ্ন ওঠে। বিচারপতি পি কে মিশ্রর বেঞ্চে শুনানি চলাকালীন সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিবাল রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর দাবি, মামলার কজ টাইটেলে যাঁর নাম রয়েছে, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনও জনস্বার্থ মামলা নয়।
সিবাল যুক্তি দেন, যদি কোনও সরকারি আধিকারিক তাঁর দায়িত্ব পালনে বাধাপ্রাপ্ত হন, তবে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার আওতায় মামলা করা যেতে পারে। তাঁর মতে, এই ক্ষেত্রে তদন্তের দায়িত্বও রাজ্য পুলিশেরই হওয়া উচিত। পাশাপাশি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ইডিকে মামলাকারী করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন। বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার অনুচ্ছেদ ৩২-এর অধীনে সরাসরি মামলা করতে পারে না। কেন মৌলিক অধিকার চেয়ে মামলা? প্রশ্ন সিবালের।
এই যুক্তির জবাবে বিচারপতি মিশ্র প্রশ্ন তোলেন - যে ঘটনায় অভিযোগই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে, সেখানে রাজ্যের কাছেই প্রতিকার চাওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? আদালতের পর্যবেক্ষণ, মুখ্যমন্ত্রী যদি নিজেই তদন্তে হস্তক্ষেপ করেন, তবে সেই সরকারের কাছেই অভিযোগ জানানো বাস্তবসম্মত নয়।
এই জায়গাতেই সিবালের পাল্টা প্রশ্ন, 'আদালত ধরে নিচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী অপরাধী?' তাঁর বক্তব্য, তদন্তকারী সংস্থার কোনও মৌলিক অধিকার নেই। ফলে তারা ৩২ বা ২২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে রিট দায়ের করতে পারে না। এই ধরনের আবেদন গ্রহণ করলে 'প্যান্ডোরা বক্স' খুলে যাবে।
অন্যদিকে, আদালত স্পষ্ট করে জানায়, ইডির আধিকারিকরা শুধুমাত্র সরকারি কর্মী বলেই তাঁদের নাগরিক অধিকার লোপ পায় না। বিচারপতি মিশ্র প্রশ্ন তোলেন, “তাঁরা কি শুধু ইডির আধিকারিক বলেই ভারতীয় নাগরিক নন?”
অভিষেক মনু সিংভি
রাজ্যের ডিজিপির পক্ষে সওয়াল করে অভিষেক মনু সিংভি প্রস্তাব দেন, মামলাটি আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না - এই প্রশ্নটা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়, যা বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো উচিত। তাঁর বক্তব্য, প্রথমে গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে পরে তা বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হবে, এমন পদ্ধতি সঙ্গত নয়। প্রসঙ্গত, মামলার সময়ে রাজ্যের ডিজি ছিলেন রাজীব কুমার।
সিংভির বক্তব্য, সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ৩২ অনুচ্ছেদে একাধিক ধারণা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত - একটি ‘ব্যক্তি’, অন্যটি ‘নাগরিক’, এবং তৃতীয়টি হল, এই অংশের অধিকার কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে সেই প্রকৃতি। এই প্রসঙ্গ টেনে সিংভির দাবি, বর্তমান মামলার আবেদনকারী ওই সংজ্ঞা অনুযায়ী না ‘ব্যক্তি’, না ‘নাগরিক’। সেই যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে তিনি সংশ্লিষ্ট রায়ের অংশ আদালতে তুলে ধরেন।
শীর্ষ আদালতে তিনি এও দাবি করেছেন, শুধুমাত্র ইডি বা কোনও দফতর আদালতে এসেছে বলেই আইনকে খেলনার মতো ব্যবহার করা যায় না। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যদি কোনও ব্যক্তিগত পক্ষ একই ঘটনায় ২২৬ অনুচ্ছেদের অধীনে মামলা করে এবং সেটি বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেই ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে একই তথ্যের ভিত্তিতে আরেকটি মামলা দায়ের করে, তা হলে আদালত সেটি সরাসরি খারিজ করে দিত।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বাকিদের মতো কল্যাণের সঙ্গে বিচারপতিদের সওয়াল-জবাব মসৃণ ছিল না। রীতিমতো বাকযুদ্ধে জড়ান তাঁরা। শুনানির মধ্যেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে বিচারপতি মিশ্র একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, “কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। ২০৩০ বা ২০৩১ সালে যদি আপনার দলই কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকে এবং সেই অন্য কোনও দলের মুখ্যমন্ত্রী একই কাজ করেন, তখন আপনি কী করতেন?”
বিতর্ক বাড়ে যখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতের একটি মন্তব্য টেনে এনে নির্বাচনের সময় আদালতের হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, “অনেক বছর আগে জমি সংক্রান্ত একটি মামলায় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, নির্বাচনের সময় আদালত এই ধরনের মামলা থেকে দূরে থাকবে।”
এই মন্তব্যের জবাবে বিচারপতি মিশ্র স্পষ্ট ভাষায় জানান, আদালতের কাজের সময় বা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার অধিকার কারও নেই। তাঁর কথায়, “আমরা নির্বাচন থেকেও দূরে থাকব, আবার অপরাধ থেকেও। আপনি (কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) ঠিক করতে পারেন না। এই ধরনের কথা বলার অনুমতি দিতে পারি না।”
এই সওয়াল-জবাবের মধ্যে দিয়েই মঙ্গলবারের মতো আইপ্যাক মামলার শুনানি শেষ হয়েছে। এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ ফের এই মামলার শুনানি হবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।