শিক্ষকরা (Teachers) বলছেন, বইতে এমন সব তথ্যগত ভুল রয়েছে, যা শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্তই করবে না, বাংলা সাহিত্য ও তার ইতিহাস নিয়েও ভুল ধারণা তৈরি করবে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 17 June 2025 08:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নতুন শিক্ষাবর্ষে উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা পাঠ্যবই (Hs Bengali book) বিতরণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই একের পর এক ভুল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। শিক্ষকরা (Teachers) বলছেন, বইতে এমন সব তথ্যগত ভুল রয়েছে, যা শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্তই করবে না, বাংলা সাহিত্য ও তার ইতিহাস নিয়েও ভুল ধারণা তৈরি করবে।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের (Subhash Mukhopadhyay) বিখ্যাত কবিতা ‘কেন এল না’-কে পাঠ্যক্রমে রাখা হয়েছে ঠিকই, তবে বইয়ে দাবি করা হয়েছে এই কবিতাটি নাকি তাঁর ‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। অথচ কবিতাটি আসলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তাঁর ‘যত দূরেই যাই’ গ্রন্থে। শুধু এখানেই নয়, কবির দেশিকোত্তম সম্মানকে ডি.লিট ডিগ্রির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অথচ এই দুটি স্বীকৃতির প্রকৃতি একেবারেই আলাদা।
এছাড়াও জীবনানন্দ দাশের (Jibanananda Das) ক্ষেত্রেও ধরা পড়েছে গুরুতর ত্রুটি। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে, কিন্তু পাঠ্যবইতে তা ১৯২৮ সাল লেখা হয়েছে। আরও অবাক করা তথ্য হল, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে জীবনানন্দ তাঁর জীবদ্দশায় কোনও স্বীকৃতি পাননি। অথচ, তাঁর কালজয়ী রচনা ‘বনলতা সেন’ প্রকাশের সময়েই সাহিত্য মহলে বিপুল প্রশংসিত হয়েছিল।
তৃতীয় ও চতুর্থ সেমিস্টারের বাংলা বইগুলোতেই মূলত বেশি ভুলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। তাঁরা বিষয়টি অবিলম্বে সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষা সংসদের কাছে।
শুধু কবিতাই নয়, গদ্য অংশেও ধরা পড়েছে বড় বড় ভুল। উদাহরণস্বরূপ, পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের এক চিঠি যা ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার সম্পাদককে লেখা। এই চিঠিতে স্বামীজি চলিত বাংলায় লেখালেখির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। অথচ বইয়ে এই চিঠির টিকা দেওয়া হয়েছে সাধুভাষায় — যা পুরোপুরি পরস্পরবিরোধী।
এছাড়া পাবলো নেরুদার একটি কবিতার অনুবাদ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদ করা ‘তার সঙ্গে’ কবিতার ভাষারীতি পাল্টে ফেলা হয়েছে বইয়ে। কোথাও আবার সাহিত্য সংকলন ও পত্রিকার মধ্যে ফারাক বোঝানো হয়নি। কোন গল্প পত্রিকায় প্রকাশিত, আর কোনটি গল্প সংকলনে প্রকাশিত— সে বিষয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।
এতসব ভুলের মাঝে আরেকটি চরম বিভ্রান্তির নজির মিলেছে ইউটিউব ক্লাসে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের ইউটিউব চ্যানেলে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় দিতে গিয়ে মারাত্মক গড়বড় হয়েছে। তাঁর লেখা ‘আদরিণী’ গল্পটি পাঠ্য হিসেবে রাখা হলেও লেখকের পরিচয় গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। গল্পকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন ১৯৩২ সালে। অথচ ভিডিওতে বলা হয়েছে তিনি নাকি রবীন্দ্র পুরস্কার, দেশিকোত্তম ও পদ্মভূষণ পেয়েছেন! প্রকৃতপক্ষে এই সম্মাননাগুলি পেয়েছেন রবীন্দ্র গবেষক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় — যিনি অন্য মানুষ।
এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, কিছু ভুলের তথ্য তাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘ভুলের ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। যে সমস্ত ভুল ধরা পড়ছে, সেগুলি দ্রুত সংশোধন করা হবে।’’
শিক্ষক মহলের দাবি, এ ধরনের ভুল শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা তৈরি করছে না, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশুদ্ধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তাই দ্রুত সংশোধনের দাবিতেই সরব হয়েছেন সকলে।