দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাস তিনেক আগের কথা। গোটা একটা বছর অবরুদ্ধ থাকার পরে দ্বার খুলেছে নেপাল। দ্বার খুলেছে পর্বতারোহীদের জন্য। কোভিডের কারণে ২০২০ সালে নেপালের পাহাড়ে পা পড়েনি কারও। ২০২১ সালে ফের আসতে শুরু করেন দেশবিদেশের অভিযাত্রীরা। যে যে শৃঙ্গে অভিযান হয়ে থাকে তাদের মধ্যে এভারেস্ট অন্যতম। তাই প্রত্যাশামতোই ভরে ওঠে এভারেস্টের বেসক্যাম্প। একটা বছর শূন্যতার পরে ফের গমগম করে ওঠে রংবেরঙের হাজারো তাঁবু। কিন্তু এর মধ্যেই দুঃস্বপ্নের মতো হানা দেয় কোভিড। সমস্ত সতর্কতা সত্ত্বেও মে মাসেই এভারেস্ট বেসক্যাম্প হটস্পট হয়ে ওঠে করোনার। একের পর এক আরোহী ফিরতে শুরু করেন নীচে।
কিন্তু এরই মধ্যে দুরন্ত কাণ্ড ঘটিয়েছেন আইটিবিপি-র এক সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার। তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এভারেস্ট বেসক্যাম্পে সুস্থ হয়ে ওঠেন ২০০ জন কোভিড আক্রান্ত আরোহী!
সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সের মেডিক্যাল অফিসার ডক্টর তরুণ রানাই মূলত দায়িত্ব নিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। বেসক্যাম্পে ২৮০ জন আরোহীর মধ্যে সন্দেহভাজন কোভিড আক্রান্ত ২০০ জন ছিলেন। ১০ লিটার মেডিক্যাল অক্সিজেন সিলিন্ডারের সীমিত জোগান, স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন, কিছু জীবনদায়ী ওষুধ-- এই সমস্তটা অতি দক্ষতার সঙ্গে, মাপমতো কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যান তিনি। সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি উচ্চতায় এই কাজ করা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের মিশেলে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন, নিজের আরোহণ স্থগিত রেখে।

তরুণ রানার কথায়, "সারা বিশ্ব থেকে বহু মানুষ এসেছিলেন বেসক্যাম্পে। ভাইরাসের সংক্রমণের উপসর্গ ছিল ২০০ জনের শরীরে। ২০ জনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক ছিল। একজনের অবস্থা বেশ খারাপও হয়, ওষুধ কাজ করেনি। ওঁকে কাঠমান্ডু নামিয়ে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করা হয়।"
চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই, নেই টেস্টের ব্যবস্থা। উপসর্গ দেখেই চলতে থাকে চিকিৎসা। "আমার কাছে একটা পাল্স অক্সিমিটার ছিল, কিন্তু এত উঁচুতে, এত ঠান্ডায় সেটা ভাল কাজ করছিল না। তাই সেটার ওপর নির্ভর করা সম্ভব হয়নি। তার ওপর রাতে তাপমাত্রা নামত শূন্যের চেয়ে ২০-২৫ ডিগ্রি নীচে। ওই ঠান্ডায় সর্দি-কাশি-মাথাব্যথা-জ্বর অনেকেরই হয়। কোভিড আলাদা করে বোঝাও চ্যালেঞ্জ ছিল।"-- বলেন তরুণ রানা।
দেখুন ভিডিও:
https://www.youtube.com/watch?v=wn3iXwX_q4Q
এর সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছিল রেশনিং করে অক্সিজেন খরচ করা। যত আরোহী ছিলেন, সকলের কাছ থেকে অতিরিক্ত অক্সিজেন বেসক্যাম্পে জোগাড় করেছিলেন তিনি। এর পাশাপাশি, আইসোলেশনে থাকা রোগীদের টেন্টে সময়মতো খাবার পৌঁছে দেওয়ার দিকেও খেয়াল রাখতে হয়েছে।
এভারেস্ট বেসক্যাম্পের প্রথম কোভিড রোগী ছিলেন জংবু শেরপা নামের এক গাইড। তিনিই প্রথম অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাশি-জ্বর তো ছিলই, তার সঙ্গে দেখা দেয় অন্য উপসর্গও। সে সময়ে তড়িঘড়ি তাঁকে হেলিকপ্টারে করে নীচে নামিয়ে এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, দেখা যায়, তিনি কোভিড আক্রান্ত। তিনি ১ সপ্তাহ হাসপাতালে কাটান। তার পরে ফের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বেস ক্যাম্পে।
এর পরেই একের পর এক অভিযাত্রী সংক্রমিত হতে শুরু করেন বেসক্যাম্পে। তাঁবুর মতো ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে থাকার ফলে সংক্রমণ ছড়িয়েছে আরও দ্রুত। অনেকের ধারণা, সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়ায় জংবু শেরপাই সঙ্গে করে নিয়ে যান করোনার জীবাণু, যা থেকে সংক্রমণ ছড়ায় হু হু করে।

যদিও প্রাথমিক ভাবে নেপাল সরকার এই তথ্য অস্বীকার করে। তাদের মতে, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে কোভিড সংক্রমণের চিহ্ন নেই। কয়েক জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। পাহাড়ের শুকনো বাতাসে এটা এমন কিছু নতুন নয়। বেশ কয়েকটি পর্বতারোহণ সংস্থা এভারেস্টে তাদের অভিযান বাতিল করার পরেও অবশ্য নেপাল সরকার সংক্রমণের কথা মানতে চায়নি।
ডক্টর রানা অবশ্য নিজের চোখে দেখেছেন পরিস্থিতি। তিনি বলছেন, "আমি একজন চিকিৎসক, সেই হিসেবে আমি আমার যা করণীয় তাই করেছি। কারও যেন মৃত্যু না হয়, সেটুকুই আমার চাওয়ার ছিল। সেই সঙ্গে আমার চিন্তা ছিল, যাতে আমি আক্রান্ত না হই।"