
শেষ আপডেট: 31 August 2021 15:12
হুগলির মুখার্জি পরিবারের সঙ্গে জালিওয়ানা বাগের সম্পর্ক কী? জানতে হলে একটু ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলাতে হয়। মনে প্রাণে কংগ্রেসি স্বাধীনতা সংগ্রামী ষষ্ঠীচরণ মুখার্জি ১৯১৯ সালে এপ্রিল মাসে পাড়ি দেন অমৃতসরে। সেখানেই ১৩ এপ্রিল জালিওয়ানা বাগের সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য দশঘড়া ছাড়েন তিনি। সেই সমাবেশের সামনের সারিতে বসে বক্তৃতা শুনছিলেন। হঠাৎই গুলির শব্দ। হুড়োহুড়ি পড়ে যায় মাঠে। চিৎকার ও কান্নার শব্দ।
আরও পড়ুনঃ বিস্মৃত মৃৎশিল্পী, ভাস্কর গোপেশ্বরের বাগবাজারের স্টুডিওই পেতে চলেছে প্রথম হেরিটেজ তকমা
মঞ্চের নীচে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বাঁচেন ষষ্ঠীচরণ। চোখের সামনে দেখেন হত্যা লীলা। বুকের মধ্যে জমে ওঠে কান্না। তবে আওয়াজ না করে চুপ করে অপেক্ষা করতে থাকেন। তারপর আর দশঘড়ায় ফেরেননি তিনি। দেশকে মুক্ত করার লক্ষ্যে অমৃতসরেই থেকে যান। সেখানে থেকেই লড়াই করেন। এই জালিওয়ানাবাগের জমি অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত করে কংগ্রেস। সেই কাজে প্রায় ৯ লক্ষ টাকা চাঁদা তোলেন ষষ্ঠীচরণ মুখার্জি। এই অপরাধে তাঁকে গ্রেফতারও করে ব্রিটিশ পুলিশ।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দেশ স্বাধীন করার কাজে ব্রতী হন তিনি। সময়ের সরণি ধরে দেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগেই স্মৃতি সৌধ তৈরির কাজ শুরু হয়। উদ্যোক্তাদের অন্যতম ছিলেন ষষ্ঠীচরণ। জালিওয়ানা বাগ থেকে স্বর্ণ মন্দির যাওয়ার রাস্তার নামও ষষ্ঠীচরণবাবুর নামে, ষষ্ঠীচরণ অ্যাভিনিউ।
জালিওয়ানাবাগ স্মৃতি সৌধ ঘিরে তৈরি ট্রাস্টের প্রথম সচিব হন তিনি। তারপর বংশপরম্পরায় এই সচিব পদে অধিষ্ঠিত হন মুখার্জি পরিবারই। ষষ্ঠীচরণের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে উপেন্দ্রনাথ মুখার্জি সচিব হন। পরে পিতা উপেন্দ্রনাথের নির্দেশেই তরুণ বয়সে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে সচিবের দায়িত্ব নেন সুকুমার।
২০১৯ সালে জালিওয়ানাবাগ হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষে এই স্মৃতিসৌধ নবরূপে নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। এই কাজেও সুকুমারবাবুর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। একনিষ্ঠভাবে সব কাজ সামলান তিনি। তবে এই স্মৃতিসৌধ নবরূপে উন্মোচন হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়।
অভিযোগ, নব স্মৃতিসৌধতে অনেক ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। যেমন, যে গলিতে ঢুকে জেনারেল ডায়ার গুলি করার আদেশ দেন সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার গুলির মুখে যে কুয়োতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন ১৩৯ জন বিপ্লবী সেটির উপরের কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর এই নিয়েই আপত্তি শুরু হয় বিরোধী শিবিরে। আম আদমি পার্টি, কংগ্রেস সহ বিভিন্ন দল এ নিয়ে সরব হয়েছে। আর তাতেই মর্মাহত হন সুকুমারবাবু। স্থানীয় অনেক সংগঠনও সংস্কারের কাজ নিয়ে আপত্তি তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে খানিক অসহায় বোধ করছেন সুকুমারবাবু। কারণ, তাঁর কিছুই করার ছিল না।
তাই এতবছর পর এবার সেই ট্রাস্টের সচিব পদ ছাড়ার কথা ভাবতে বসেছেন সুকুমারবাবু। আর সেই ভাবনার কথা ফোনে জানাতে গিয়ে গলা ভিজে যায় সুকুমারবাবুর। বলছিলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগে থেকে যাবেন বলে, দাদুর দশঘরার জমি স্থানীয় স্কুলকে দান করে দিয়ে। জলিয়ানওয়ালাবাগের জমিও দিয়েছেন স্মৃতিসৌধের এলাকা প্রসারের জন্য।
সুকুমারবাবুর দুই মেয়ে প্রতিষ্ঠিত। তারাও চান বাবা এবার ট্রাস্টের সচিবের কাজ ছেড়ে দিন। তাই জালিওয়ানাবাগের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত মুখার্জি পরিবারের যোগ হয়তো এবার শেষ হবে। আগে বারবার এই সচিব পদ ছাড়ার কথা বললেও সেকথা কানেই তোলেননি সুকুমারবাবু। কিন্তু স্মৃতিসৌধ নিয়ে বিতর্কের জেরে দায়িত্ব ছাড়ার কথা ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন তিনি। আর তা হলে শেষ হবে এক অধ্যায়ের।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ