
শেষ আপডেট: 19 November 2019 18:30
বর্জ্যের পর বর্জ্যের ঢল মিশেছে গঙ্গার মিঠে জলে। ফলে বাসা হারিয়েছে ডলফিনরা। সংসার ভেঙেছে কতজনের। যে শব্দের জাল বুনে তারা প্রেম নিবেদন করত প্রণয়ীর কাছে, সে শব্দ চাপা দিয়েছে জাহাজের কর্কশ আওয়াজ। দিক নির্ণয় থেকে শিকার ধরা, সবই শব্দ বুনেই করে গঙ্গার ডলফিনরা। জাহাজ, স্টিমারের চড়া শব্দ, মানুষের কোলাহল, শব্দদানবের অত্যাচারে তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন। জলের দূষণ, জেলের জাল, নদীর বাঁধ ও মানুষের অত্যাচার— এই চারের সাঁড়াশি আক্রমণে বিলুপ্তির খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছে গঙ্গার শুশুকরা। তাদের শব্দের তরঙ্গে দাঁত বসাচ্ছে জলজ যানের তীক্ষ্ণ আওয়াজ। ফলে দিক নির্ণয় করতে না পেরে অধিকাংশই পথ হারাচ্ছে। ঠোক্কর খেতে খেতে কেউ ভিড়ছে অজানা চরে, আবার কেউ ধাক্কা খাচ্ছে জাহাজের নোঙরে। ফল ভয়ঙ্কর মৃত্যু।
গাঙ্গেয় ডলফিন Platanista gangetica। দৈর্ঘ্যে মিটার দেড়েক। স্ত্রী ডলফিনরা পুরুষের চেয়ে আকারে বড়। ওজন প্রায় ১৫০ কেজি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা কর্নফুলি, ঘর্ঘরা নদীতে এদের বাস। দক্ষিণবঙ্গের নদীগুলিতেও একটা সময় প্রচুর পরিমাণে গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুকের দেখা মিলত। এখন সেই সংখ্যা হাতে গোনা। নেপাল, বাংলাদেশেও এই প্রজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন। তার কারণ অনেক। বেঙ্গালুরুর ‘অশোকা ট্রাস্ট ফর রিসার্চ, ইকোলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এর গবেষক নচিকেত কেলকার বলেছেন, শুশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিনদের বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ গঙ্গায় দূষণ। তরল ও কঠিন বর্জ্য তো বটেই, শব্দ দূষণের মাত্রাও এতটাই সাঙ্ঘাতিক যে ডলফিনরা আর নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে পারছে না। গাঙ্গেয় ডলফিনদের বলা হয় Blind Dolphin। এরা মূল আলট্রাসনিক সাউন্ডের সাহায্যে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখে চলে। দিক স্থির করে, শিকার ধরে। মাছের ঝাঁকের শব্দ শুনে এরা বুঝতে পারে ঠিক কোন জায়গায় রয়েছে তাদের শিকার। নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্যও শব্দ তরঙ্গের একটা নির্দিষ্ট মাত্রা আছে ডলফিনদের সংসারে। সেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে শব্দদূষণের তাণ্ডব।
২০০৯ সালে ডলফিনকে ‘ন্যাশনাল অ্যাকোয়াটিক অ্যানিম্যাল অব ইন্ডিয়া’র মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গঙ্গার ক্রমবর্ধমান দূষণে অরা আজ বিলুপ্তির পথে। শুশুক বাঁচাতে বহু দিন ধরে আন্দোলন করছে দেশের একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ— মূলত যে তিনটি রাজ্যের মধ্য দিয়ে গঙ্গা বইছে, তাদের শুশুক গণনা করতে বলেছে কেন্দ্রীয় জলসম্পদ, নদী উন্নয়ন ও গঙ্গা সংস্কার মন্ত্রক। গবেষকরা বলছেন, গঙ্গার দূষণ সামুদ্রিক জীবচক্রকেই পাল্টে দিচ্ছে। দূষণের কারণে মাছ কমে যাচ্ছে গঙ্গায়। ফলে ডলফিনের সংরক্ষণ নিয়েও সমস্যা শুরু হয়েছে। একটা পূর্ণবয়স্ক ডলফিন দিনে পাঁচ-ছয় কেজি জ্যান্ত মাছ খেত, এখন সেই খাবারে টান পড়ছে।

সম্প্রতি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’-এর বিপন্নতালিকাভুক্ত প্রাণী শুশুকের উপরে সমীক্ষা চালিয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ)-এর গবেষকেরা। তাঁরা জানান, অবাধে মাছ ধরা ও গঙ্গায় দূষণ বেড়ে যাওয়ায় ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ছে শুশুকেরা। ফরাক্কা থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত সমীক্ষা চালিয়ে খুব কম জায়গাতেই মিলেছে শুশুকের ঝাঁক। দেখা গিয়েছে, হুগলির একাংশ ছাড়া বেশির ভাগ এলাকাতেই বাচ্চা শুশুকের সংখ্যা কম। যা থেকে গবেষকেরা মনে করছেন, শুশুকদের বংশবৃদ্ধিতেও বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। আবার গভীর সমুদ্রে ট্রলিং খুব বেড়ে গিয়েছে। মাছ ধরার ট্রলারগুলির দৌরাত্ম্যে দলছুট হয়ে দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে ডলফিনরা। বিহারের ‘ডলফিন ম্যান’ রবীন্দ্রকুমার সিং একার চেষ্টায় ভাগলপুরের বিক্রমশিলায় গঙ্গার ৫০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি করে ফেলেছেন শুশুকের নিরাপদ আস্তানা (স্যাংচুয়ারি)। সেখানে বহু বছর ধরেই চলছে গাঙ্গেয় ডলফিন বাঁচানোর লড়াই।
২০১০-১৩ পর্যন্ত বিশেষ পর্যবেক্ষণে গঙ্গা ছাড়াও চুর্ণি, জলঙ্গি, রূপনারায়ণ, দামোদর, দ্বারকেশ্বর ও শিলাবতীর মতো এ রাজ্যের বেশ কিছু নদীতে এদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এখন সেই সংখ্যাও খুব কম। গোটা দেশে গাঙ্গেয় ডলফিন কমতে কমতে এখন ১৬০০-এর কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। তাদের চর্বি থেকে তৈরি তেল মাখলে বাতের ব্যথার উপশম হয়, সাধারণ মানুষের এই ভ্রান্ত ধারণাই ওই জলজ প্রাণীর অস্তিত্বের সঙ্কট বাড়িয়েছে বলে মমে করেন জীববিজ্ঞানীরা। এবং সেই ধারণা মূলধন করেই চোরাশিকারিরা নদীতে জাল পাতছে।
আরও পড়ুন:
https://www.four.suk.1wp.in/news-us-scientist-claims-photos-show-evidence-of-life-on-mars/