তিয়াষ মুখোপাধ্যায়
হিমালয়ে তো কত মানুষ যান। কত পর্যটন, কত অভিযান, কত ভ্রমণ প্রতি বছর আয়োজিত হয় হিমালয় জুড়ে। আর এ সবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন হিমালয়ের অসংখ্য মানুষ। কেউ গাইড হয়ে পথ দেখান, কেউ জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যান সঙ্গে, কেউ শেরপা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যান উচ্চতায়। যাঁরা একটু বেশি উচ্চতার শৃঙ্গে অভিযানে যান, তাঁরা জানেন শেরপাদের প্রয়োজন কতটা। কিন্তু হিমালয় জুড়ে বসবাস করা এই অসংখ্য মানুষের কথা ক’জন ভাবেন? ক’জন ভাবেন, পর্যটন মরসুম ছাড়া বাকি সময়টায় কী ভাবে দিন কাটে মানুষগুলোর? তাঁদের পরিবার, সন্তান, সংসার— কেমন করে এগোয় জীবন?
বিশ্ব পর্বত দিবস আজ
বাইরে থেকে কেউ কারও কথা ভাবতে পারে না আসলে। নিজের কথা নিজেকেই ভাবতে হয়। প্রথম পদক্ষেপটা নিজে না রাখলে, এগোনো সম্ভব হয় না।

হিমালয়ের শেরপা-জগতে সেই প্রথম পদক্ষেপের অধিকারী মানুষটির নাম আপা শেরপা। আজ, বিশ্ব পর্বত দিবসে মনে করে নেওয়া যায়, শেরপা সম্প্রদায়ের শিশুদের জীবনে শিক্ষার আলো দেখানোর এক অনন্য উদ্যোগ নেওয়া মানুষটির কথা। তাঁর নিজে হাতে গড়া ‘আপা শেরপা ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে শেরপা শিশুদের জন্য স্কুল তৈরি হয়েছে নেপাল হিমালয়ের কোলে। বেশ কিছু স্কুলের দায়িত্বও নিয়েছে এই ফাউন্ডেশন।
২১ বার এভারেস্ট আরোহণের নজির গড়া আপা শেরপা
আপা শেরপা নিজে ছোটবেলা থেকেই হতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক। হতে পারেননি। পড়াশোনাই করতে পারেননি ঠিকমতো। শেষমেশ বাধ্য হয়ে বাবা-কাকার পথ ধরেই শুরু করেন অভিযান। শেরপা হিসেবে বিভিন্ন অভিযাত্রী দলের সহায়ক হিসেবে কাজ করতে হয় তাঁকে।

সে কাজ করতে গিয়ে নিজের ২১ বার এভারেস্ট চড়া হয়ে গিয়েছে আপা শেরপার। পাহাড়-জীবন জুড়ে অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন এবং ভেঙেছেন তিনি। কিন্তু সব কিছুর পরেও থেকে গেছে আক্ষেপ। পড়াশোনা না করতে পারার আক্ষেপ।
জীবন বাজি রাখার এ পেশা থেকে ছুটি চায় শেরপা সম্প্রদায়
সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়। সম্প্রতি নেপাল হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গ অভিযানে দুর্ঘটনার সংখ্যা এত বেড়ে গিয়েছে, এত বেশি সংখ্যায় শেরপা মারা যাচ্ছেন এই পেশায়, যে কোনও পরিবারই আর চাইছে না তাঁদের সন্তানরা পর্বত অভিযানকে পেশা হিসেবে নিক।

বরং তাঁরা চান, লেখাপড়া শিখে নিরাপদ কোনও চাকরি করুক তারা। অর্থ উপার্জনের জন্য জীবন বাজি রাখার এই পেশাকে বংশপরম্পরায় বয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন না অনেকেই।
শিক্ষার পথে আলো ধরলেন তিনি
এই অবস্থায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা যে কতটা, তা বুঝেছিলেন আপা। তাই ২০১২ সালে নিজের নামেই ফাউন্ডেশনটি গড়ে তোলেন তিনি। ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শেরপা শিশুদের জন্য বেশ কয়েকটি স্কুল গড়া হয় গ্রামে গ্রামে। যেখানে স্কুল বিল্ডিং বানানো সম্ভব নয়, সেখানে বড় টেন্ট পেতেই বসে পাঠশালা।

দায়িত্বও নেওয়া হয় কিছু স্কুলের। যেমন, আপা শেরপার নিজের গ্রামের স্কুলে আট জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও সরকার মাত্র তিন জনের বেতন দিতে পারত৷ ফলে ঠিক মতো পঠনপাঠন হতো না সেখানে। তাই বাকি পাঁচ জন শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়েছে আপা শেরপার ফাউন্ডেশন৷

শুধু তাই নয়। শিশুদের পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলতে স্কুলগুলিতে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয় ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে৷ পৌঁছে দেওয়া হয় কম্পিউটার, বইখাতা, শিক্ষাসামগ্রী। নিয়মিত গরম পোশাকেরও ব্যবস্থা করা হয় স্কুলগুলিতে। কারণ হিমালয়ের ওই উচ্চতায় কড়া ঠান্ডার সঙ্গে পাল্লা দেওয়াটাই একটা চ্যালেঞ্জ। ভাল পোশাকের অভাবে অনেকেই স্কুলছুট হয়ে যায় তাই। গ্রামে পৌঁছনো হয় সোলার টর্চ, মাঝেমাঝেই আয়োজন করা হয় স্বাস্থ্য শিবির।
পড়ার জন্য ছ'ঘণ্টার পাহাড়ি পথ হাঁটতে হতো
আপা শেরপার বয়স এখন ৫৯৷ দারিদ্র্য আর সুযোগ-সুবিধার অভাবে যে শৈশব হারিয়েছিলেন, সে শৈশবের জন্য এখনও আক্ষেপ রয়ে গেছে তাঁর৷ আপা বলছিলেন, সেই সময় তাঁর গ্রামে যে স্কুল ছিল, তাতে মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হতো৷

এর পরে পাশের গ্রামের স্কুলে গিয়ে আরও দু'বছর লেখাপড়া করেছেন তিনি৷ তবে সেই পাশের গ্রামে যাওয়ার জন্য তাঁকে প্রত্যেক দিন ছ’ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো! এর পরে বাবা মারা যাওয়ার পরে পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হন আপা। তাই মাত্র ১২ বয়সেই মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে আসা বিদেশি পর্বতারোহীদের দলে কাজ করতে শুরু করতে হয়েছিল আপা শেরপাকে৷ প্রথমে টুকটাক মাল বওয়া এবং রান্নায় সাহায্য করার কাজ করতেন তিনি। সেই শুরু।
সুপার শেরপারও চোখে জল!
এর পরে ৩০ বছর বয়সে প্রথম এভারেস্ট শৃঙ্গ স্পর্শ করেন আপা। ততদিনে দক্ষ গাইড হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু এভারেস্ট অভিযানের পরে আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক আরোহণে গড়তে থাকেন রেকর্ড। ‘সুপার শেরপা' নামে ডাকা হতো তাঁকে৷

কিন্তু নিজের সাফল্য যত বড়ই হোক না কেন, মৃত্যুকে বহুবার খুব কাছ থেকে দেখেছেন আপা শেরপা। সয়েছেন বহু অপমান। সাক্ষী থেকেছেন বহু বিশ্বাসহীনতার। এবং রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করেছেন, পর্বতারোহণের পেশায় পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ঝুঁকি। প্রাণের ভয় এখানে নিত্যসঙ্গী। এই পথেই চিরকাল তাঁদের চলতে হবে, তাঁদের সন্তানদেরও চলতে হবে-- এ ভাবনা যেন কাঁদিয়ে দিত তাঁকে।
বাধ্য হয়ে প্রাণের ঝুঁকি, আর নয়
আপা শেরপা বলেন, ‘‘সকলেই যে অভিযাত্রী হতে চায়, তা নয়। বেশির ভাগ শেরপাই পেটের টানে পাহাড়ে যায়। তাদের অন্যকাজ করার সুযোগ ও সামর্থ্য না থাকায়, পরিবারের মুখ চেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে তারা৷ প্রতিবছর কত শেরপা পরিবার সন্তানহারা হয়, কত তরুণী স্বামীহারা হন, কত শিশু বাবাকে হারায় তার ইয়ত্তা নেই।" গলা ভারী হয়ে আসে আপার।

তাই তাঁর জেদ, "আমি চাই, আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ যেন এমন না হয়। কাউকে যেন বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসতে না হয়। আমি চেষ্টা করব, আমাদের বাচ্চাদের ন্যূনতম পড়াশোনাটুকু করার সুযোগ করে দিতে, যাতে তারা অন্তত বিকল্প কোনও কাজের কথা ভাবতে পারে৷''
...দূর করো এই তামসীরে
এখন আমেরিকায় থাকেন আপা শেরপা। সেখানেই কাজ করে অর্থ উপার্জন করেন। তাঁর নিজের সন্তানরা সেখানে পড়াশোনা করে। কিন্তু প্রতি বছরই নেপালে আসেন আপা শেরপা। তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য কাজ করেন সাধ্যমতো। ফাউন্ডেশনের তরফে নতুন নতুন স্কুলের আলো জ্বালান বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে।

লক্ষ্য একটাই, পেটের দায়ে যেন বিপদের পথে হাঁটতে না হয় কাউকে। আর তার উপায় কেবল শিক্ষা। আপা বলেন, "উইদাউট এডুকেশন উই হ্যাভ নো চয়েস।" অর্থাৎ, শিক্ষা ছাড়া আমরা কোনও কিছুই বেছে নেওয়ার সুযোগ পাব না।