দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিজের পছন্দে এক যুবককে ভালবেসে বিয়ে করেছিল কিশোরী মেয়ে। সেই 'অপরাধে' তার গলা কেটে নৃশংস ভাবে খুন করল বাবা! ইরানের এই ঘটনার কথা সামনে আসার পরে সারা দুনিয়ায় সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। অনার কিলিং বা পারিবারিক সম্মানরক্ষার্থে খুনের কথা সেভাবে শোনা যায় না এই দেশে। কিন্তু এই ঘটনাটি যেন নাড়িয়ে দিয়েছে সকলকে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ৩২১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের কাউন্টি তালেশের শহর। সেখানেই রমিনা আশরাফি নামের ১৪ বছরের এক কিশোরী ভালোবাসত ২৯ বছরের এক যুবককে। বিয়েও করতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু তাদের পরিবার এই বিয়ে মেনে নিতে সম্মত না হওয়ায় মে মাসের মাঝামাঝিতে যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যায় ওই কিশোরী। প্রসঙ্গেত উল্লেখ্য, ইরানের আইন অনুযায়ী ১৩ বছর বয়সে আইনত বিয়ের উপযুক্ত হয়ে যায় মেয়েরা।
তবে কয়েক দিন পরেই রমিনার বাবার দায়ের করা পুলিশি ডায়েরির ভিত্তিতে রমিনাকে ধরে ফেলে পুলিশ। তার পরে তাকে পরিবারের জিম্মায় ফিরিয়েও দেওয়া হয়। যদিও জানা যায়, রমিনা পুলিশের কাছে বারবার অনুরোধ করে তাকে বাড়ি না পাঠানোর। তার আশঙ্কা ছিল, তাকে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু তার অনুরোধে সাড়া দেয়নি পুলিশ। এমনকি রমিনার বাবা রেজা আশরাফি জানান, মেয়েকে ক্ষমা করে দিয়েই ঘরে ফেরাচ্ছেন তিনি।
কিন্তু বাবার ছল ও মিথ্যে ধরতে পারেনি রমিনা। তবে এও ভাবতে পারেনি, তার আশঙ্কা সত্যি হবে! জানা গেছে, মে মাসের ২১ তারিখে রমিনা যখন ঘুমোচ্ছিল নিজের ঘরে, তার বাবা একটি কাস্তে নিয়ে মেয়ের মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেয় দেহ থেকে! এই ঘটনায় বাবা অপরাধ স্বীকারও করেছে এবং পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। এর পরেই জানাজানি হয় ঘটনাটি। পরিবারের সম্মান রক্ষার যুক্তিতে ‘অনার কিলিং’ নামক এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছে ইরানের মানুষ। ঝড় উঠেছে সামাজিক মাধ্যমেও। প্রশ্ন উঠেছে, বাবা যদি এমন নির্মম ঘাতক হন, তাহলে সন্তানেরা কোথায় সুরক্ষিত!
ইরানের আইন-উপমন্ত্রী মাহমুদ আব্বাসি বলেন, "যথাযথ বিচার হবে এই ঘটনায়। আইন মেনেই হত্যাকারীকে কঠিন সাজা দেব আমরা। রমিনার মতো আর কাউকে যাতে এভাবে জীবন দিতে না হয় আমরা সে ব্যবস্থাও গ্রহণ করব।"
ইরানের আইন অনুযায়ী কোনও ব্যক্তি যদি তার মেয়েকে খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে তাকে ৩ থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়ার নিয়ম রয়েছে। যদিও অন্যান্য খুনের ক্ষেত্রে সাধারণত অর্থ বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রৌহানি আইন বদলের জন্য পার্লামেন্টে বিল আনার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা খোমেইনি বলেছেন, "কঠিনতম শাস্তি হোক এই ঘাতক পিতার।"
জানা গেছে, চরম নৃশংস ভাবে মেয়েকে হত্যা করার পরে আশরফি নিজেই কাস্তেসহ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন ও নিজের দোষ স্বীকার করে নেন। পুলিশ তাঁকে জেরা করে জানিয়েছে, মেয়েকে সুপরিকল্পিত ভাবে মেরেছে আশরফি। মারার আগে তিনি একজন আইনজীবীকে ডেকে কথা বলেন। ভাল করে জেনে নেন, তিনি পারিবারিক সম্মান রক্ষায় মেয়েকে খুন করলে তাঁর কী সাজা হবে। ৩ থেকে ১০ বছরের কারাবাসের বেশি কিছু হবে না জেনেই খুনের পরিকল্পনা আরও পোক্ত করেন ৩৭ বছরের আশরফি।
গোটা ঘটনার কথা জেনে শিউরে উঠছে ইরান। দেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। প্রতিবাদ ঘনিয়েছে নারী নিরাপত্তা নিয়ে। অনেক মহিলা সামনে এনেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে ঘটা পারিবারিক হিংসা ও নির্যাতনের কথা। ৪৯ বছরের এক মা, তেহরানের বাসিন্দা মিনু যেমন লিখেছেন, তাঁর ১৭ বছরের মেয়েকে একটি পুরুষবন্ধুর সঙ্গে রাস্তায় দেখে, মেয়েকে বেধড়ক মেরেছিলেন বাবা। দর্শনের গবেষক তরুণী হ্যানিয়ে রাজাবি টুইট করে জানান, তিনি আইসক্রিম খেতে খেতে রাস্তায় হাঁটছিলেন বলে তাঁর বাবা তাঁকে বেল্ট দিয়ে মেরেছিলেন।
এ সমস্ত জবানবন্দির কোনও শেষ নেই রমিনার ঘটনা সামনে আসার পরে। হাজার হাজার রমিনা সরব হয়েছেন নিরাপত্তার ও স্বাধিকারের দাবিতে। এমনিতে বলা হয় মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলির মধ্যে ইরানে মেয়েদের অবস্থা ও অবস্থান অনেক ভাল। মেয়েদের কর্মসংস্থান বেশি, গোঁড়ামিও অনেক কম। ট্রাকচালকের আসন থেকে ক্যাবিনেটের সিট-- সবেতেই অবাধ বিচরণ মেয়েদের। কিন্তু এই আলোকিত আধুনিকতার আড়ালে যে আদতে কতটা অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা প্রমাণ করে এই ঘটনাগুলি।
ইরানের মেয়েদের বয়ানই বলছে, এ দেশে অনার কিলিং বিরল হওয়ার কারণ যতটা না সামাজিক উদারতা, তার চেয়ে অনেক বেশি মেয়েদের চুপ করিয়ে দেওয়া। ২০১৯ সালের একটি রিপোর্ট বলছে, দেশে যত খুন হয়েছে, তার ৩০ শতাংশই মহিলা। বেশিরভাগই পরিবারের অমতে কোনও না কোনও সম্পর্কে ছিলেন। অেকেই দুইয়ে-দুইয়ে চার করছেন সহজেই। যদিও এই মৃত্যুর সংখ্যাটা এখনও অজানা, কারণ ইরান তার দেশের অপরাধের সংখ্যা কখনও বাইরে প্রকাশ করে না।

রমিনার বাবা এখন জেলে। আর রমিনার হাসিমুখের ছবি এখন ভাইরাল সর্বত্র। তার মৃত্যু আদতে কণ্ঠ খুলে দিয়েছে আরও হাজার রমিনার। উত্তর ইরানে রমিনার লামির গ্রামের একটি পাহাড়ের উপরে কবরে ঘুমিয়ে আছে সে। তার স্কুলের বান্ধবীরা রোজ বিকেলে সে সমাধিতে রেখে আসে ফুল। প্রার্থনা করে বন্ধুর জন্য, নিজেদের জন্য করে সঙ্কল্প। এমনটা আর ঘটতে দেবে না তারা।