সাবেকি থেকে বারোয়ারি, প্রবীণ থিম মেকারদের চোখে এখনকার পুজো
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেখতে দেখতে এসে গিয়েছে দুর্গাপুজো (Durga Pujo)। প্রতি বছর এই কয়েকটা দিনের জন্য সারা বছর দীর্ঘ অপেক্ষার পথ পেরোন বাঙালিরা। সেই দুর্গাপুজো ঘিরে শহরের বুকে সাজ-সাজ পরিবেশ তৈরি হয় সর্বত্র। থিমের (Theme) লড়াইয়ে একে অপরকে টক্কর দ
শেষ আপডেট: 7 October 2021 15:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেখতে দেখতে এসে গিয়েছে দুর্গাপুজো (Durga Pujo)। প্রতি বছর এই কয়েকটা দিনের জন্য সারা বছর দীর্ঘ অপেক্ষার পথ পেরোন বাঙালিরা। সেই দুর্গাপুজো ঘিরে শহরের বুকে সাজ-সাজ পরিবেশ তৈরি হয় সর্বত্র। থিমের (Theme) লড়াইয়ে একে অপরকে টক্কর দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে শহরের ছোট-বড় ক্লাবগুলো।
সালটা ১৯৮৫। 'শুদ্ধ সুচি, শুদ্ধ রুচি', এই ক্যাপশনের ওপর ভর করেই শহরের থিমের রমরমা শুরু। এটা একটি বেসরকারি রঙ প্রস্তুকারক কোম্পানির স্লোগান। শারদীয়া সম্মান দিতে শুরু করে এই কোম্পানি। বনেদিয়ানা, সাবেকি পুজোর রমরমার মধ্যে শুরু হয় বারোয়ারি পুজোতে থিমের লড়াই। একটি কনসেপ্টকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ তৈরি হয়। ক্লাবের টাকায় শিল্পীরা তাঁদের ভাবনা ও কাজকে পরিস্ফুট করতেন। সেই শুরু পথ হাঁটা।
আস্তে আস্তে সেই থিমের লড়াই এক ব্যাপক চেহারা নেয় কলকাতার দুর্গাপুজোয়। পুজো মানে তো আসলে শুধু পুজো নয়, হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজি, পরিশ্রম জুড়ে তৈরি হয় এই পুজো। কোটি কোটি টাকার উৎসব। শহরের সব পুজোই প্রতি বছর কিছু নতুনত্বের জন্য মুখিয়ে থাকে। গজিয়ে ওঠে বিভিন্ন সম্মানের। বিভিন্ন সংস্থা মূল্যায়ন করে পুরস্কার তুলে দেয় ক্লাবের হাতে। এটাই যেন প্রাপ্তি।
আরও পড়ুন:
নেশার 'টান' দূর হোক, ধূমপান বিরোধী সচেতনতার বার্তা বোসপুকুর পুজোয়
তবে এত আরম্বড়ের মধ্যে এখন কি আদৌ প্রকৃত ভাবনা পরিস্ফুট হচ্ছে? থিমেও কি সেই ভাবনা থাকছে? নাকি হারিয়ে যাচ্ছে? "থিম আস্তে আস্তে কিছু উদ্ভট বাংলা শব্দের প্রয়োগ হয়ে উঠছে। চলছে কথার জাগলারি। থিমের অর্থ হারিয়ে যাচ্ছে"-- এমনটাই মত শহরের থিমের কাজ শুরু হওয়ার গোড়ার দিকের শিল্পী দীপক ঘোষের।
দীর্ঘ বছর পুজোর থিমের কাজের সঙ্গে যুক্ত দীপক ঘোষ, অমর সরকার, রণ ব্যানার্জির মতো শিল্পীরা। বহু বড় বড় থিমের কারিগররা গত দুই-তিন বছর নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়েছেন পুজোর কাজের থেকে। কিন্তু কেন? প্রবীণ শিল্পী দীপক ঘোষের কথায়, "শিল্পের একটা দাম থাকে। এখন ক্লাবগুলো অল্প রসদে অভিনবত্ব কাজ চাইছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় রসদের অভাবে বহু ভালো কাজ পূর্ণতা পাচ্ছে না। নামের খেলাতে মেতে গেছে এখনকার থিম। বাইরে জাঁকজমকের চাদর থাকলেও ভেতরে অভাব থাকছে ভাবনার।"
পুজোর থিমের অন্যতম জাদুকর রণ বন্দ্যোপাধ্যায় দু'বছর হল নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন পুজোর থেকে। সরাসরি না বললেও বর্তমান পুজোর কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট নন তিনিও। তাঁর কথায়, "যেভাবে আমরা কাজ করেছি, সেই কাজ আর হচ্ছে কই? আমরা তো আর নিজের ইচ্ছায় কাজ করি না, ক্লাবের ইচ্ছায় কাজ করি। কিন্তু যে ধরনের কাজ আমি করেছি বা করি, সেই রকম কাজ করার তাগিদ তেমন দেখতে পায়নি কোনও ক্লাবকে।"
বিজ্ঞাপন জগৎ থেকে উঠে আসা রণর অবশ্য কোনও আক্ষেপ নেই দু'বছর কাজ না করতে পেরে। একবছর বেহালার একটি ক্লাবে 'রুরাল ম্যানশন' তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। একটি গ্রামের দুই ভাইয়ের উপাখ্যান তুলে ধরেছিলেন। একজন ঐতিহ্য বাঁচাতে ব্যস্ত, অন্যজন পুজোয় পরিযায়ী বাঙালি। সেখান থেকে ঐতিহ্য অনেক দূরে। এই ধরণের বাস্তবসম্মত কাজের অভাব দেখছেন প্রবীণ শিল্পী রণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে করোনার মতো মহামারী পুজোর উন্মাদনায় ভাঁটা ফেলেছে বলে মনে করেন আরেক প্রবীণ শিল্পী অমর সরকার। তাঁর কথায়, "সময় তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। থিম পুজোর গোড়া থেকে ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটেছে। তেমনই এখনও পরিবর্তন হচ্ছে। তবে এখন প্রচুর নতুন ছেলেমেয়ে কাজ করছে। সবার কাজ তো এক রকম হবে না। কোথাও গিয়ে অভিজ্ঞতার একটা জায়গা থাকে।"
তবে তিনি কাজ না করলেও তাঁর বহু ছাত্রছাত্রী এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁরা একসময় তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে দিয়েই এখন নিজের কাজ দেখতে পান অমর সরকার। এভাবেই প্রবীণ শিল্পীদের চোখে আজ পেরোচ্ছে একের পর এক থিমের পুজো।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'