জমিদারি না থাকলেও আভিজাত্যের গড়িমায় খামতি টানতে চাননি চকদিঘির জমিদার সারদপ্রসাদ সিংহরায়ের উত্তরসুরীরা।

চকদিঘির জমিদার বাড়ির পুজো
শেষ আপডেট: 23 September 2025 18:56
জামালপুরের চকদিঘির সিংহরায় জমিদার বাড়ি। জমিদারি প্রথা এখন আর নেই। তবুও শুধুমাত্র আভিজাত্য বজায় রাখতে দুর্গা পুজোর সময় এই পরিবারের মহিলাদের আজও পর্দার আড়ালে থাকতে হয়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব কালে এই বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন হয়। সেই সময়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জামালপুরের চকদিঘির জমিদারদের নাম। ঐতিহ্য পরম্পরা মেনে এই বাগানবাড়ির সুবিশাল মন্দিরে তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে পুজিতা হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা। জমিদারি না থাকলেও আভিজাত্যের গড়িমায় খামতি টানতে চাননি চকদিঘির জমিদার সারদপ্রসাদ সিংহরায়ের উত্তরসুরীরা।
এই জমিদার বংশের খ্যাতি শীর্ষে পৌঁছেছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের হাত ধরে। প্রজাবৎসল জমিদার সারদাপ্রসাদ তাঁর জমিদারি এলাকার প্রভুত উন্নতি সাধন ও শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। চকদিঘিতে তিনি বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জমিদারদের ’বাগান বাটির’ ভিতর কাছাড়ি বাড়ির সামনেই রয়েছে দুর্গা পুজোর স্থায়ী মন্দির। মন্দিরের সঙ্গেই রয়েছে টিনের ছাউনি দেওয়া বিশাল আকার বসার জায়গা। জমিদার বাড়ির বর্তমান কেয়ারটেকার পীযুষ বিদ জানান, এই জমিদার পরিবারের অপর দুর্গা মন্দিরটি রয়েছে চকদিঘি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মণিরামবাটি গ্রামে। সেখানকার মন্দিরটিও একই আদলে তৈরি। সেখানেও জমিদারি ঐতিহ্য মেনে দুর্গা পুজোর যাবতীয় আয়োজন করা হয়। পঞ্জিকার সময় সারণী মেনে একই সময়ে দুই বাড়ির মন্দিরে হয় পুজো। ব্যবসা ও কর্মসূত্রে সিংহরায় পরিবারের বর্তমান সদস্যরা বছরের বাকি দিনগুলিতে কলকাতা ও অন্যত্র কাটান ঠিকই। তবে পুজোর ক’টাদিন গোটা পরিবার একত্রিত হন চকদিঘির বাগান বাটিতে ।
বৈদিক মতে সিংহরায় জমিদার বাড়িতে হয় দুর্গা আরাধনা। একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে প্রতিমা সাজানো হয়। দেবী মূর্তির দু’পাশে বসানো থাকে জয়া ও বিজয়া নামে দুই পরীর মূর্তি। মন্দির চত্বর সাজানো হয় ভিন্ন আঙ্গিকে। একটি গোটা নারকেল, আম্র পল্লব ও একটি কাঁঠালি কলা একসঙ্গে নিয়ে বাঁধা হয় মন্দিরের প্রতিটি থামে। প্রতিপদের দিন থেকে শুরু হয় পুজো।
পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট মেনে পুজো করেন হুগলির লোকনাথ এলাকার বাসিন্দা কুল পুরোহিত। পুজোয় অন্যান্য ফল যাই থাক কাজু, কিসমিস,পেস্তা,আখরোট ও মেওয়া চাই-ই। নৈবেদ্যতে সাজানো হয় চিনির সন্দেশ, ছোট ও বড় মুণ্ডি, ডোনা,নবাত, রশকরা, মুড়কি। পারিবারিক নিয়ম মেনে স্থল পদ্মে হয় দেবীর পুজো। একমাত্র সন্ধিপুজোয় লাগে ১০৮ টি জলের পদ্ম। পুজোর প্রতিটি দিন দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় হরেক রকম নিরামিষ ভোগ। মহাষ্টমীর দিন থেকে পুজোর নৈবেদ্যে দেওয়া হয় ’মাখা’ সন্দেশ। নবমীর দিন একই সময়ে চকদিঘি ও মণিরামবাটির মন্দিরে কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়।
জমিদার বাড়ির পুজোর জোগাড়ে এখনও মহিলাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ। সবকিছুই করেন জমিদার বংশের পুরুষরা। গবেষক শ্যামসুন্দর বেরা জানান, সিংহরার পরিবারের মহিলাদের পুজোয় সময় এখনও পর্দার আড়ালেই থাকতে হয়। অন্দরমহল থেকে পরিবারের মহিলারা মন্দিরে পুজো দিতে কিংবা ঠাকুর দেখতে আসার সময় তাদের পথের দু’পাশ আড়াল করার জন্য কাপড় দিয়ে ‘কানাত’ অর্থাৎ ’পর্দা’ টাঙানো হয়।বাড়ির বউ ও মহিলারা ওই পর্দার পেছনে থাকেন। বংশ পরম্পরয়ায় এই ঐতিহ্য মেনে আসা হচ্ছে। জমিদার বাড়ির মেয়ে ও বউদের মুখ অন্য কেউ যাতে দেখতে না পায় তাই এই ব্যবস্থা তৈরি রাখা থাকে বলে পরিবার সদস্যদের কথায় জানা গিয়েছে।