মরেও ইচ্ছেপূরণ হলো না, দেহ দেওয়া গেল না হাসপাতালে
মধুরিমা রায়
মরণোত্তর দেহদান আজকাল অনেকেই করতে চান। এই মহৎ দানে আগে সচেতনতার অভাব নিয়ে খবর হতো। এখন লোকজন চাইলেও তাঁদের মৃত্যুর পরে দেহদান করা সম্ভব হচ্ছে না। ২৫ শে ডিসেম্বর বড়দিনের ছুটিতে যখন মশগুল শহর, তখন নাগেরবাজার সাতগাছি এলাকার আনন্দব
শেষ আপডেট: 26 December 2018 18:30
মধুরিমা রায়
মরণোত্তর দেহদান আজকাল অনেকেই করতে চান। এই মহৎ দানে আগে সচেতনতার অভাব নিয়ে খবর হতো। এখন লোকজন চাইলেও তাঁদের মৃত্যুর পরে দেহদান করা সম্ভব হচ্ছে না। ২৫ শে ডিসেম্বর বড়দিনের ছুটিতে যখন মশগুল শহর, তখন নাগেরবাজার সাতগাছি এলাকার আনন্দবিহারের লোকজন নাকাল হলেন শহরের সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থায়।
১৯৯৮ সালে এন আর এস হাসপাতালে দেহদান করেছিলেন অরুণ কুমার মুখার্জী। তাঁর ছেলে এবং পুত্রবধূ চাকরিসূত্রে বাইরে থাকেন। ২৫ তারিখে বেলা ১টা ৪০ নাগাদ হৃদরোগে মৃত্যু হয় অরুণ বাবুর। প্রতিবেশী পার্থ চৌধুরী-সহ বাকিরা মৃতের ছেলে অরুময় মুখার্জীকে জানিয়ে এন আর এসে পৌঁছন কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে।
এন আর এস থেকে বলে দেওয়া হয় সেখানে দেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। দেহ সংরক্ষণ করতে যে সব ওষুধ দেওয়ার কথা, তা নেই। শেষে বলা হয় ছুটির দিন লোক নেই! এই বিষয়টি জানিয়ে দ্য ওয়াল কথা বলেছিলাম এন আর এসের সুপার ডঃ সৌরভ চ্যাটার্জীর সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর এ বিষয়ে কোনও খবর জানা নেই। অ্যানাটমি বিভাগে কথা বলে তাঁকে জানতে হবে। তাঁর পক্ষে না জেনে বলা সম্ভব নয়।এন আর এসে এই অবস্থা দেখে পার্থবাবুরা চলে যান আর জি কর হাসপাতালে। সেখানে গিয়েও যথেষ্ট চেষ্টা করেন তাঁরা অরুণবাবুর শেষ ইচ্ছে কোনওভাবে যাতে রাখা যায়। কিন্তু সেখানেও বলা হয় প্রচুর দেহ আগে থেকে রাখা আছে তাই আর দেহ এখন রাখা যাবে না। তবু চেষ্টা ছাড়েননি পাড়ার বন্ধুরা। আরো একদিন তাঁরা অরুণবাবুর দেহ রেখে দেন দমদম মিউনিসিপ্যালিটি হাসপাতালের পিস হাভেনে। বুধবার সকালে চেষ্টা করা হয় শেষবার, যাতে দেহদানের ইচ্ছে সম্পন্ন হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। নিমতলা শ্মশানে দাহ করা হয় অরুণবাবুর দেহ। তাঁর ছেলে অরুময় বাবু বলেন যেখানে বলা হচ্ছে দেহ কী ভাবে রাখা হবে তার কোনোও নিশ্চয়তা নেই,সেখানে ডিকম্পোজ হতে পারে। তাই আর সমস্যা বাড়াননি তাঁরা।


আর জি করের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আমরা কথা বললে তিনি জানান সাধারণত বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সাধারণ মানুষজন চুক্তি করেন দেহদানের। এক্ষেত্রে সেই সংস্থার সঙ্গে হাসপাতালের সম্পর্ক কেমন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও বলেন যেসব আন্দোলন হয় দেহদানের সচেতনতা নিয়ে তা সবসময়েই প্রশংসাযোগ্য। এদের উদ্যোগ এবং প্রচারেই লোকজন সচেতন হয়েছেন। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে কিছু ডেটা রাখা উচিত। তাতে অন্তত বোঝা যাবে কোথায় দেহদান সম্ভব কি পরিস্থিতি রয়েছে,তাতে মৃতের পরিবার কম ঝামেলায় পড়েন। সংবেদনশীলতাও খুব প্রয়োজন ,হাসপাতাল কর্মীরা শুধু কর্তব্য করে না গিয়ে এই বিষয়গুলো আরও সংবেদনশীল হয়ে দেখুন,তাহলে মানুষ এ ভাবে এগিয়ে এসে ফিরে যাবেন না। যা হয়েছে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলেই মনে করেন ডঃ গঙ্গোপাধ্যায়।
এ জাতীয় সচেতনতা বাড়িয়েছেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে অন্যতম গণদর্পণের কর্মকর্তা শ্যামল চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে এবিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেন সদিচ্ছা সবক্ষেত্রে এখনোও আসেনি। এলে এই ভোগান্তি হত না আজ। তবে সরকারি আরোও কিছু জায়গাও আছে ,লোকজন এখনও সেগুলো সম্পর্কে জানেন না। আরোও বেশি করে জানাতে হবে লোকজনকে। এন আর এস এবং আর জি করে এই সমস্যা এ মাসে হবে, এখনও যে অবস্থা আছে। পরের মাস থেকে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। তবে পিজি ,চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল,ইন্সটিটিউট অফ হোমিওপ্যাথি ইত্যাদি জায়গাগুলোতে দেহদানের জন্য যেতে পারেন মৃতের পরিবারের লোকজন। সবশেষে তিনি বলেন সরকারি নজরদারির প্রয়োজন আছে,সদিচ্ছার ,তাগিদের দরকার আছে। যাতে এই সচেতনতা আরও ছড়িয়ে পড়ে লোকজনের মধ্যে।
অর্থাৎ শুধু ইচ্ছে থাকলেই উপায় আর হচ্ছে না আজকাল। শহরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গ্রিন করিডরের মাধ্যমে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সাফল্য যেমন খবর হয় তেমনি মরণোত্তর দেহদানের শতচেষ্টায় ব্যর্থতাও সংবাদ শিরোনামে আসে। এক পা এগিয়ে দু পা পিছিয়ে যেভাবে যুদ্ধের সাফল্য আসে সে ভাবে জীবন তো চলে না। অন্তত স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে তো নয়ই। তাই সবস্তরেই প্রয়োজন সচেতনতা।