
শোভন চট্টোপাধ্যায় ও বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সৌম্যদীপ সেন
শেষ আপডেট: 23 February 2025 20:04
কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, 'হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়/ সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়/ এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে/ সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়।' সহজ যে নয়, শোভন-বৈশাখী অনেক আগেই বুঝে গেছেন। পরকীয়া নিয়ে সমাজের এক শ্রেণির গঞ্জনা, শোভন চট্টোপাধ্যায়ের (Sovan Chatterjee) স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের (Ratna Chatterjee) সঙ্গে ডিভোর্স মামলা (Divorce Case), আদালতের বাইরে কদর্য আক্রমণ-- এখনও পর্যন্ত ব্যাপারটা খুব একটা মসৃণ হয়নি।
তবু সুড়ঙ্গের শেষে তো আলো থাকে। শনিবাসরীয় সন্ধেয় লেক-সংলগ্ন ফোর্ট লিজেন্ডের ফিফটিনথ ফ্লোরের বৈঠকখানায় কথা হচ্ছিল তাঁদের সঙ্গে। ব্যাপারটা আলটপকা নয়। এর একটা প্রেক্ষাপট রয়েছে। শোভন-রত্নার ডিভোর্স মামলাকে কেন্দ্র করে খানিকটা তরজাই চলছে এখন। এই মামলায় শোভনের আইনজীবী হয়েছেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে পাল্টিবাজ, মিথ্যাচারী বলেছেন রত্না। তার পরই তু তু ম্যায় ম্যায়.. যেমনটা হওয়া অনিবার্য ছিল!
সে যাক। বৈশাখীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই যে অধ্যায় চলছে, অদূরে কি আলো দেখতে পাচ্ছেন? উদযাপনের আলো? যে ঝলমলে অনুষ্ঠানে যদিদং হৃদয় তব... মন্ত্র পড়ে সাত পাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাঁধা পড়বেন তিনি ও শোভন চট্টোপাধ্যায়।
বৈশাখী প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী। কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। মোটেও লাজুক নন। বরং বরাবরই সপ্রতিভ। তা ছাড়া শব্দচয়নেও যত্নশীল। তবু এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অদ্ভুত একটা আভা যেন তাঁর মুখে।
বললেন, 'আমি মনে করি বিবাহ ব্যাপারটা খুব সুন্দর করে একটা সম্পর্কের সূচনা করে। আমাদের একসঙ্গে পথ চলা বহু বছর আগে শুরু হয়েছে। কিছু তারিখ নিয়ে অবশ্যই আমাদের সেন্টিমেন্টস আছে (যেমন, প্রথমবার দেখা, প্রথমবার প্রেম নিবেদন করা ইত্যাদি)। সেগুলো ঘটা করে সেলিব্রেট না করলেও আবেগের তীব্রতা তো থাকেই। তবে হ্যাঁ, এও ঠিক এমন একটা সম্পর্ক সবসময়েই সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ারও চেষ্টা করে।'
বৈশাখীর কাছে এটুকু শুনেই বোঝা যাচ্ছিল, 'দ্য ওয়াল' সঠিক আন্দাজই করেছিল। আনুষ্ঠানিক ভাবে বিবাহ বন্ধনে জড়ানোর ব্যাপারে শোভন-বৈশাখী জুটির একটা আগাম পরিকল্পনা রয়েছে। শোভন বরাবরই মানসিক ভাবে উচ্ছল। পোশাক-আশাকে ব্র্যান্ড বিলাসী। বৈশাখীও আধুনিক লব্জে ভাইব্র্র্যান্ট। তাঁদের ভবিষ্যৎ সামাজিক অনুষ্ঠানে ঔজ্জ্বল্য ও বহুবর্ণের সমাহার থাকবে, তা ধরেই নেওয়া যায়।
বৈশাখীর পরের কথাগুলো থেকে প্রাক পরিকল্পনার আন্দাজও পাওয়া গেল বইকি। তাঁর কথায়, 'আমাদেরও নিশ্চয়ই একটা লক্ষ্য রয়েছে। যাঁরা এই যুদ্ধে আমাদের পাশে ছিলেন, ঝড় থামলে তাঁদের নিয়ে নিশ্চয়ই সেলিব্রেশন হবে। নিশ্চয়ই একটা আনন্দ অনুষ্ঠান হবে। তবে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং নিয়ে শোভন বা আমার আগ্রহ নেই। যা হবে এখানেই হবে।'
বৈশাখী যখন এ কথাগুলো বলছেন, ঠায় তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন শোভন। মিটমিট করে হাসছিলেন প্রাক্তন মহা নাগরিক। সেই ফ্রেম ধরে রাখার মতোই প্রেমঘন।
অগ্নিসাক্ষী রেখে সেই আনুষ্ঠানিক বিবাহ অনুষ্ঠান শেষমেশ কবে হবে, তা অবশ্যই আদালতের বিচারের উপর নির্ভরশীল। কারণ, ডিভোর্স মামলার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। রত্না চট্টোপাধ্যায় আবার হুমকি দিয়ে রেখেছেন, তিনি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাবেন।
পরের কথা পরে। তবে কারও যদি আগের কথা জানার আগ্রহ থাকে তাহলে এই প্রেম সম্পর্কের শুরুর কিসসা একবার জেনে নিতে পারেন। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোটবন্দির ঘোষণার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে মহাসংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতায় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অফিসের সামনে এক টানা তিন দিন ধর্না হবে। দলের সমস্ত বড় নেতা মন্ত্রী সেখানে থাকবেন।
সেই নোটবন্দির প্রতিবাদ মঞ্চেই সম্ভবত দ্বিতীয় দিনে হঠাৎ দেখা যায় বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বৈশাখী যখন মঞ্চে, শোভন তখন নীচে। ব্যাকস্টেজে দাঁড়িয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম আর দুই সাংবাদিকের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। ববিই তাঁকে বলেন, বৈশাখী মঞ্চে রয়েছেন। তোর সঙ্গে আলাপ আছে? কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, শোভন একটা সিগারেট বের করে লম্বা লম্বা বেশ কয়েকটা টান দেন। তার পর পকেট থেকে সাদা একখানা রুমাল বের করে, চশমা বাঁ হাত দিয়ে খুলে, ডান হাত দিয়ে মুখটা মুছে নেন। সাদা রঙের সেই রুমালের কোণে সোনালি সুতোয় এম্ব্রয়ডারি করে লেখা ছিল ‘হ্যারডস’।
মুখ মোছা হলেই শোভন আর কথা না বাড়িয়ে মঞ্চে উঠে পড়েন। একেবারে বৈশাখীর পাশে গিয়ে বসেন। এর পর গল্প এগিয়ে চলে। পরকীয়া, প্রেম, ভালবাসা, একসঙ্গে থাকা, রঙমিলন্তি পোশাক পরা...। এখন শুধু অধীর অপেক্ষা পুরনো সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে নতুন বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার।