দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা সংক্রমণে মৃত্যুহার সবচেয়ে কম ভারতে। কেন্দ্রের পরিসংখ্যাণে এমনটাই দেখা গেছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশের করোনা রোগীদের বেশিরভাগের শরীরেই ভাইরাস সংক্রমণ ছাড়াও অন্যান্য রোগের প্রভাবও দেখা গেছে। বিশেষত দেশে ৭৬ শতাংশ কোভিড রোগী কো-মর্বিডিটির শিকার। মারণ ভাইরাসের সংক্রমণ ছাড়াও হাইপারটেনশন ও ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে বেশিরভাগেরই শরীরে।
কেন্দ্রের তথ্য বলছে, কোভিড পজিটিভ রোগীদের নমুনা পরীক্ষা করে জানা গিয়েছে, অন্তত ৫.৭৪ শতাংশ রোগী হাইপারটেনশনে আক্রান্ত, ৫.২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস। তাছাড়া, বয়স জনিত অসুস্থতা, লিভারের রোগ, ক্রনিক কিডনির রোগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ম্যালিগন্যান্সি, ব্রঙ্কাইটিস, নিউরোমাস্কুলার রোগ, কম প্রতিরোধ ক্ষমতা ইত্যাদি রোগেও কাবু দেশের বেশিরভাগ ভাইরাস আক্রান্তই।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ক্রনিক রোগের কারণে ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে শরীরে। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা ক্রনিক ফুসফুসের রোগ যাদের আছে তারা খুব তাড়াতাড়ি সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হতে পারে। দেখা গেছে, ইনটেনসিভ কেয়ারে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা বা কৃত্রিম অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা বেশিরভাগ করোনা রোগীই কো-মর্বিডিটির শিকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মৃত্যুহার দিয়ে কখনওই সংক্রমণের সামগ্রিক তীব্রতা বোঝানো সম্ভব নয়। কারণ মৃত্যুহার নির্ভর করে বয়স, কো-মর্বিডিটি, জনগোষ্ঠীর বয়সভিত্তিক অনুপাত-সহ একাধিক বিষয়ের উপরে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক জানাচ্ছে, গতকাল অর্থাৎ সোমবার অবধি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৩% কোভিড রোগীরই বয়স ৪০ বছর বা তার বেশি, অন্তত ১০ শতাংশ রোগীর বয়স ষাটের বেশি। প্রবীণ রোগীদের অধিকাংশই ক্রনিক কিডনি রোগ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
দেশে করোনা রোগীদের ৬৮.৪৮ শতাংশ পুরুষ। মহিলাদের সংখ্যা তুলনায় কম ৩১.৫১%। স্ত্রী হরমোন ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে মহিলারা কম সংক্রামিত হচ্ছেন এমন দাবি করা হয়েছে দেশি ও বিদেশি বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায়। দাবি করা হয়েছে, স্ত্রী যৌন হরমোন ইস্ট্রোজেন ভাইরাস রিসেপটর প্রোটিনের প্রভাব কমাতে পারে। যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে নানা মতভেদ আছে।
ডায়াবেটিস আর হাইপারটেনশনের সঙ্গে করোনার সম্পর্ক নিয়েও নানা মত আছে। এই দুই রোগের প্রভাবে ভাইরাসের সংক্রমণ চটজলদি ধরতে পারে এমন দাবি করা হয়েছে, আবার ভাইরাসের সংক্রমণের কারণেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। হাইপারটেনশন ডায়াবেটিসের রোগীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি, এমন দাবি আগেই করেছিলেন গবেষকরা। সম্প্রতি লন্ডনের কিংস কলেজ, অস্ট্রেলিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটি, ইম্পিরিয়াল কলেজ অব লন্ডন, জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ড্রেসডেন ও সিঙ্গাপুরের ন্যানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষকরাও বলেছেন, রোনায় সংক্রামিত হলে রোগীদের টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে। ডায়াবেটিস এমন একটা রোগ যেখানে রক্তে শর্করা বা সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করে ইনসুলিন নামে একটি হরমোন যা প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল থেকে নিঃসৃত হয়। সাধারণত, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেলে সেটি লিভারে গিয়ে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়। ইসুলিন এই গ্লুকোজকে দেহকোষের মধ্যে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। কোষের ভেতরে গ্লুকোজ অক্সিডাইজড হয়ে অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট (এটিপি) তৈরি করে যার থেকে শক্তি আসে। এই শক্তিই কোষের পুষ্টি যোগায়। টাইপ-১ ডায়াবেটিস তখনই হয় যখন প্যানক্রিয়াসের বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন হরমোনের ক্ষরণ কমে যায়। ইনসুলিনের ঘাটতি হলে দেহকোষে গ্লুকোজ ঢুকতে পারে না, ফলে শক্তিও তৈরি হয় না। সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রমণ হলে প্যানক্রিয়াস থেকে এই ইনসুলিন হরমোন ক্ষরণের মাত্রাই কমে যায়। গবেষকরা বলছেন, এই ভাইরাস প্যানক্রিয়াসে সরাসরি ঢুকে বিটা-কোষকে সংক্রামিত করছে। যার কারণে ইনসুলিন হরমোন বের হতে পারছে না। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ছে।