
শেষ আপডেট: 3 November 2023 14:23
শত চেষ্টাতেও কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না রাজধানীর বায়ুদূষণ। বাতাসের গুণগত মান এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের গ্রাফ ক্রমেই নিম্নমুখী। ধোঁয়াশায় বিপর্যস্ত দিল্লিবাসী। দিন দিন আরও ধূসর হচ্ছে সে ছবি। শীতের মুখেই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ৪০০-র গণ্ডি ছুঁয়েছে। সূর্যের মুখ আর দেখতে পাচ্ছেন না দিল্লিবাসী। ধোঁয়াশা কালো কম্বল যেন আষ্টেপৃষ্টে মুড়ে ফেলেছে রাজধানী শহরকে। ছুটি হয়ে গেছে স্কুল-কলেজ। বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও দূষিত কণার পরিমাণ দেখে এখন এশিয়ার অন্যতম দূষিত শহর বলা হচ্ছে দিল্লিকে। কলকাতা অতটা না হলেও পিছিয়ে নেই।
দূষণ নিয়ন্ত্রক পর্ষদের রিপোর্ট বলছে, শুক্রবার দিল্লির বাতাসের গুণগত মান অর্থাৎ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ৩৪৬। তবে দিল্লির লোধি রোড, জহাঙ্গিরপুরী এবং ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় এআই যথাক্রমে ৪৩৮, ৪৯১, ৪৮৬ ও ৪৭৩। গত কয়েকবছরে নাকি এত খারাপ হয়নি দিল্লির পরিস্থিতি। দিল্লির মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (MCD) রীতিমতো রাস্তায় রাস্তায় জল ছিটিয়ে ধোঁয়ার গাঢ়ত্ব কমানোর চেষ্টা করছে। কেন এত দূষণের বাড়াবাড়ি দিল্লিতে, পিছিয়ে নেই কলকাতাও? কীভাবে কমানো যাবে দূষণের পাল্লা? বিকল্প উপায়ই বা কী? এইসব নিয়েই দ্য ওয়ালকে বললেন প্রযুক্তি-পরিবেশবিদ সোমেন্দ্র মোহন ঘোষ এবং পরিবেশবিজ্ঞানী স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী।
প্রযুক্তি-পরিবেশবিদ সোমেন্দ্র মোহন ঘোষ বললেন, কলকাতা ও রাজ্যের অনেক জেলা থেকেই কর্মসূত্রে দিল্লিতে যান বহু মানুষ। পরিযায়ীরা পুজো মিটতেই দিল্লিতে ফিরে গিয়েছেন। তাঁদের এখন খুব সাবধানে থাকতে হবে।
কী কী সতর্কতা নিতে হবে?
মুখে মাস্ক পরা খুব জরুরি।
এমন খাবার খেতে হবে যা শরীরে পুষ্টির চাহিদা মেটায়।
ফলমূল একটু বেশি খাওয়া ভাল যাতে ফাইবার আছে।
যাঁরা বেশি দূষণ কবলিত এলাকায় কাজ করেন তাঁদের নিয়মিত কলা খেলে খুব ভাল। শ্বাসের সঙ্গে যে দূষিত কণা শরীরে ঢুকছে তা প্রথমে গলার কাছে জমে থাকে। সূক্ষ্ম অ্যারোসল কণা মিউকাসের সঙ্গে মিশে ফুসফুশে ঢুকলে তা সিভিয়ার হাঁপানির কারণ হতে পারে। কলা খেলে গলা থেকে সেই দূষিত কণা সহজেই নেমে যায়। ফলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
শ্রমিকরা যাঁরা দিনভর বাইরে কাজ করছেন তাঁরা সঙ্গে অবশ্যই কাশির ওষুধ রাখবেন।
অ্যান্টিবায়োটিক সবসময় সঙ্গে রাখতে হবে। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে অ্যান্টিবায়োটিক সঙ্গে রাখবেন।
কাদের বেশি সাবধানে থাকতে হবে?
সারাদিন পাথর ভাঙার কাজ, গ্রাইন্ডিং মেশিনে কাজ করছেন যাঁরা বা মেটাল পালিশ, রাজমিস্ত্রীর কাজে নির্মীয়মাণ স্থলে বহুক্ষণ থাকতে হচ্ছে তাঁদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কাজের সময় অবশ্যই ফেস-মাস্ক পরে থাকতে হবে।
দিল্লিতে একিউআই ৪০০, কলকাতাতে আজই ২০০
সোমেন্দ্রবাবু বলছেন, দিল্লিতে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ৪০০ ছাড়িয়েছে, একে বলা হচ্ছে ‘সিভিয়ার হেলথ হ্যাজার্ড।’ পড়শি রাজ্য পাঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে খড়কুটো পোড়ানোর ধোঁয়া বিষ-বাষ্প তৈরি করছে। এদিকে কলকাতাও পিছিয়ে নেই। আজ শুক্রবারই কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এলাকায় একিউআই ২০০-র বেশি। কালীপুজো-দিপাবলির পরে তা ৩০০-৪০০ তে পৌঁছে যাবে।
বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, সবচেয়ে দূষিত বায়ু কলকাতা ও দিল্লি এই দুই শহরেই। বায়ুদূষণ যে-হেতু চোখে দেখা যায় না, ফলে তার ক্ষতির পরিমাণটি বোঝা কঠিন। সোমেন্দ্রবাবু বলছেন, শুধু ভাসমান ধূলিকণা (পিএম১০) ও অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণাই (পিএম ২.৫) নয়, যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় বাতাসে নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রাও বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। বায়ুমণ্ডলে ওই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা (পিএম)-গুলি খুব সহজে মিশে যেতে পারে। কিন্তু যদি পিএম কণাগুলির ব্যাস বেশি হয় তাহলে বায়ুমণ্ডলে মিশে যেতে সময় লাগে বেশি। বিদ্যুৎকেন্দ্র, গাড়ি, ট্রাক, অগ্নিকাণ্ড, ফসল পোড়ানো ও কারখানার চিমনি থেকে এই দূষণ-কণাগুলি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বাতাসের ধূলিকণাকে আশ্রয় করে বিষ-বাস্প তৈরি করে।
সমস্যাটা আজকের নয়। তিলে তিলে দূষণের মেঘ গ্রাস করেছে দিল্লিকে, এমনটাই বললেন পরিবেশবিজ্ঞানী স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী। বছরের পর বছর ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। দূষণের এই দাপট শুরু হয় খারিফ সিজন থেকে। শস্য তোলার পরে তার গোড়া পুড়িয়ে দেন চাষিরা। ফসল পোড়ানোর সেই ধোঁয়া যে কত গ্রিন হাউস গ্যাসের জন্ম দেয় তা বুঝতেই পারেননা চাষিরা। দিল্লি-সহ নয়ডা, গ্রেটার নয়ডা, গাজিয়াবাদ, গুরুগ্রামের আকাশ ভরে যায় ওই খড় পোড়া ধোঁয়াতে। এই ধোঁয়ার সঙ্গেই যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণ সংস্থাগুলির বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিলে গিয়ে ঘন ধোঁয়াশা তৈরি করে। তার সঙ্গেই মেশে দীপাবলির আতশবাজির ধোঁয়া। এইসবই ঘন মেঘের মতো এসে জমে দিল্লির আকাশে। তারপর কালো কম্বলের মতো ঢেকে দেয় আস্ত শহরটাকে।
স্বাতী বলছেন, ফসল কাটার পরে তার গোড়াগুলো স্তুপাকৃতি করে সেখানেই রেখে দেয় চাষিরা। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে ধান কাটার পরে খেতে রয়ে যাওয়া ধানগাছের মূল ও খড়ের বোঝা থেকে নিস্তার পাওয়ার সবচেয়ে সস্তা উপায় হল আগুন লাগিয়ে দেওয়া। পরিবেশের যে দফারফা হচ্ছে, তা মাথায় রাখা হয় না। বারবার বলার পরেও তাঁরা এই পন্থাতেই ফসল কাটার আবর্জনা পোড়াতে শুরু করেন। ফলে চলচ্ছক্তিহীন ধোঁয়াশা চাদরের মতো ঝুলে থাকে দিল্লি-সহ নয়ডা, গ্রেটার নয়ডা, গাজিয়াবাদ, গুরুগ্রামের উপরে। কার্যত তামাম ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিওন’ ঢাকা পড়ে যায়। রীতিমতো বিপর্যয় পরিস্থিতির তৈরি হয় যা হচ্ছে এখন।
আরও একটা বিপর্যয় হয় যা পরিবেশের প্রভূত ক্ষতি করে। মাটিতে জন্মালে উপকারি মাইক্রোঅরগ্যানিসজম বা ব্যাকটেরিয়ারা (Soil Bacteria)এই ফসল পোড়া ধোঁয়াতে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হতে থাকে।
বিকল্প উপায় কী?
খড়কুটো ও ফসল কাটার আবর্জনাকে অবশ্যই ভাল কাজে ব্যবহার করা যায়। পরিবেশবিজ্ঞানী স্বাতী বলছেন, চাষিদের এই ব্যাপারে সচেতন করা দরকার। কিছু উপায় আছে যাতে এই ভয়ানক দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
খারিফ সিজনে ফসল কাটা হবেই, কাজেই তা রোধ করা যাবে না। প্রথমত যেটা করা যাবে তা হল ওই খড়কুটো গোবর বা ইউরিয়া, গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে পশুখাদ্যে রূপান্তরিত করা। , খড়ের এ হেন বিকল্প প্রয়োগ করে মায়ানমার সাফল্য পেয়েছে। স্বাতী বলছেন, এখানেও অনেক বিজ্ঞানের সভা ও সমাবেশে এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যা কার্যকর করা যায়নি এখনও। ফসল কাটার আবর্জনাকে ‘বায়োওয়েস্ট’-এ বদলে দেওয়াই সবচেয়ে সহজ ও উপকারি পন্থা।
দ্বিতীয়ত ফসল কাটার পরে ফসলের গোড়া বা জমা করা খড়কুটো অন্য শিল্পের কাজে লাগানো যেতে পারে। এই খড়কুটো যে খুব ভাল প্লাইউড বা বোর্ড তৈরির কাজে লাগে, তা জানেনই না চাষিরা। এই বর্জ্য ফেলে না দিয়ে বরং তা রিসাইকেল করে কাঁচামাল হিসেবে অন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে বহু মানুষের উপকারও হবে।
দিল্লি শুধু নয় এ রাজ্যেও খড়কুটো পোড়ানোর ধোঁয়া বাতাস বিষিয়ে দিচ্ছে। সিঙ্গুর, হুগলির কিছু জায়গা, নিউটাউনে ঝোপঝাড়ের মতো ফসল পোড়ানো হচ্ছে। সেই ধোঁয়া মিশছে বাতাসে। সেই সঙ্গেই কালীপুজোর সময় বাজি পোড়ানোর ধোঁয়া মিলে বাতাসের গুণমান তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে যে হারে নগর উন্নয়ন হচ্ছে তাতে নির্মাণ কাজ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্মাণ কাজের সময় যে ধুলো তৈরি হয় তা ছড়িয়ে পড়া আটকাতে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া এখনই প্রয়োজন।