দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা জয় করলেন দক্ষিণ কলকাতার তরুণী। ইকমো সাপোর্টে টানা ১২ দিন থাকার পরেও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফেরার ঘটনা ভারতে এই প্রথম। সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগীদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিয়েও কাজ না হলে ইকমো সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হয়। অত্যন্ত জটিল এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই শুরু হয়ে যায়। সেই অবস্থা থেকেই সংক্রমণ সারিয়ে ফিরেছেন ২৪ বছরের ওই তরুণী। তাঁকে সুস্থ করে নজির গড়েছে ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতাল।
ইকমো হল ‘একস্ট্রা-কর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশন’ পদ্ধতি। একে ‘একস্ট্রা-কর্পোরিয়াল লাইফ সাপোর্ট’ (ECLS) বলা হয়। হার্ট ও ফুসফুসের রোগে এই পদ্ধতির প্রয়োগ করেন ডাক্তাররা। শ্বাসপ্রশ্বাসে যখন স্বাভাবিক ভাবে অক্সিজেন ঢুকতে পারে না শরীরে, এমন ভেন্টিলেটরের মতো যান্ত্রিক পদ্ধতিতেও কাজ হয় না, তখন কৃত্রিমভাবে এই পদ্ধতিতে শরীরে অক্সিজেন ঢোকানো হয়। সাধারণত হাইপোক্সেমিক রেসপিরেটোরি ফেইলিওরের রোগীদের এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয়। এর জন্য শরীরে থেকে রক্ত বার করে, তার মধ্যে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড ছেঁকে বার করে পরিশোধন করে আবার শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। খুবই জটিল এই পদ্ধতিতে সাড়া দিয়েছিলেন তরুণী এবং তাঁকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন ডাক্তাররা।
কালিঘাটের বাসিন্দা ওই তরুণীকে ঢাকুরিয়ার আমরিতে ভর্তি করা হয় গত ১৭ মে। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, ভর্তির সময় পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল তরুণীর শরীরে স্বাভাবিক অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে ৩৪%। তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। তড়িঘড়ি তাঁকে জরুরি বিভাগে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
ক্রনিক কোনও রোগ ছিল না তরুণীর। ডাক্তাররা বলেছেন, প্রথমে মনে হয়েছিল স্থূলতা বা ওবেসিটির কারণেই এই শ্বাসের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তরুণীর ওজন ছিল ১০০ কিলোগ্রাম। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, গলা ব্যথার মতো উপসর্গ দেখে কোভিড টেস্ট করানো হয়। সেই রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ডাক্তাররা বলছেন, সংক্রমণ এতটাই মারাত্মকভাবে ছড়িয়েছিল যে শুরু থেকেই ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে হয় তরুণীকে।
দেখুন ভিডিও।
https://www.facebook.com/TheWallNews/videos/632543570688245/
করোনা রোগী যদি তীব্র শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ অ্যাকিউট রেসপিরেটারি ডিসট্রেস সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হন, তখন তাঁকে বাইরে থেকে অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হয়। সেই কাজ করে ভেন্টিলেটর। আমরির ডাক্তারদের কথায়, কালিঘাটের বাসিন্দা ওই তরুণীকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রেখেও লাভ হয়নি। তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছিল। অক্সিজেন পৌঁছতে পারছিল না ফুসফুসে। তাই ভর্তির পরদিনই ভেন্টিলেটর সাপোর্টের পাশাপাশা তাঁকে ইকমো (ECMO) সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হয়। গত ১৮ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত প্রায় ৩০০ ঘণ্টা ইকমো সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাঁকে। ইকমো সাপোর্ট থেকে বার করার পরেও ভেন্টিলেটর সাপোর্টে ছিলেন তরুণী। শারীরিক অবস্থা পুরোপুরি স্থিতিশীল হওয়ার পরে গত ৫ জুন ভেন্টিলেটর সাপোর্ট থেকে বার করা হয় তাঁকে।
[caption id="attachment_228053" align="alignleft" width="171"]
শাশ্বতী সিনহা[/caption]
আমরি হাসপাতালের ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডাক্তার শাশ্বতী সিনহা বলেছেন, “প্রথম যখন তরণীকে আমরা ভর্তি করি তখনই তাঁর অবস্থা ছিল সঙ্কটজনক। ভেন্টিলেটর সাপোর্টে কাজ না হলে ইকমো সাপোর্টের কথাই ভেবেছিলাম আমরা। ভেন্টিলেটর সপোর্টে রেখেও তরুণীর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ৮২ তুলতে পারছিলাম না আমরা। যেখানে অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল ৯০- উপর থাকার কথা। আমরা খুশি যে সেই পদ্ধতিতে কাজ হয়েছে। মেয়েটাকে বাঁচাতে পেরেছি।”
আমরির ইকমো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সোহম মজুমদার বলেছেন, এর আগে চেন্নাই ও দিল্লি এইমসে ভর্তি দু’জন কোভিড রোগীকে ইকমো সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। তবে তাঁদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এই তরুণী ভেন্টিলেটর ও ইকমো সাপোর্টের পরেও ভাইরাসকে হারিয়ে দিয়েছে। সংক্রমণ সারিয়ে সুস্থ হয়েছে। কোভিড চিকিৎসায় যা এখনও অবধি
[caption id="attachment_228063" align="alignright" width="167"]

সোহম মজুমদার[/caption]
অন্যতম সাফল্য বলা যায়।
ডাক্তার সোহম বলেন, তরুণীর শরীর থেকে রক্ত নিয়ে তাকে ‘রি-অক্সিজেনেটেড’ করা হয়েছিল। এইভাবেই শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানো হয়। যার ফলেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারেন তরুণী।
[caption id="attachment_228060" align="alignleft" width="132"]

মহুয়া ভট্টাচার্য[/caption]
আমরি হাসপাতালের ক্রিটিকাল কেয়ার ও ইন্টারনাল মেডিসিনের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডাক্তার মহুয়া ভট্টাচার্য বলেছেন, এই ইকমো পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। সবসময় সফল হবে সেটা বলা যায় না। তবে এক্ষেত্রে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে তরুণীকে। তিনি জানান, সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগী যাঁদের ফুসফুসে সংক্রমণ বেশিমাত্রায় ধরে নেয়, তাঁদের শুধুমাত্র ভেন্টিলেশন সিস্টেমে সুস্থ করা যায় না। ইকমো হল এমন একটা পদ্ধতি যেখানে রোগীর শরীরে বাইরে থেকে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া যায় আবার ফুসফুসের ক্ষতও মেরামত করা যায়।
“আমাদের ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট খুব ভাল কাজ করেছে। তরুণীকে বাঁচাতে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। আমরা গর্বিত যে আমাদের হাসপাতালে সঙ্কটাপন্ন রোগীকে বাঁচাবার মতো পদ্ধতি ও পরিকাঠামো রয়েছে। রোগীদের সবচেয়ে ভাল চিকিৎসাই দেব আমরা,” বলেছেনে রূপক বড়ুয়া, আমরি হাসপাতালের গ্রুপ সিইও।