দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাহাড়পথে অভিযান করে সুউচ্চ শৃঙ্গ ছোঁয়ার মতো সাফল্য স্পোর্টস দুনিয়ায় হয়তো কমই আছে। তাই তো মাউন্টেনিয়ারিংকে বলা হয় 'কিং অফ স্পোর্টস'। কিন্তু কখনও কখনও সেই দুর্গম পথে যাঁরা সারাক্ষণ বন্ধুর মতো সামনে ও পিছনে থেকে আসল লড়াইটা করেন তাঁরা শেরপা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। মালবাহক বা রাঁধুনি বা অন্যান্য সহায়ক-- সব রকম ভূমিকায় পাহাড়ে আরোহীদের পাশে থাকেন তাঁরা। এই মানুষগুলোর এখটা বড় অংশের জীবনও চলে এই পেশার উপর ভিত্তি করেই। কিন্তু করোনা মহামারী ও তার জেরে লকডাউনের কারণে টান পড়েছে সেই পেশাতেও। ফলে তাঁদের অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন চাষবাস বা অন্যান্য পেশায়।

ছোট্ট দেশ নেপালের গোটা অর্থনৈতিক কাঠামোই দাঁড়িয়ে আছে এই পর্যটন শিল্প এবং বিশেষ করে পর্বতারোহণ অভিযানের ওপরেই। প্রতিবছর শুধু এভারেস্ট আরোহণের টানেই দেশ-বিদেশ থেকে মানুষজন ছুটে আসেন এই সময়টায়। বসন্ত পরবর্তী এই আরোহণ মরসুমের ওপর ভিত্তি করেই গোটা দেশের বহু মানুষেরই দিনযাপন হয়। তাই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সঠিক রাখতে অতিরিক্ত মুনাফার তাগিদেই প্রতিবছরেই দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসা বিপুল অভিযাত্রীকে এভারেস্ট ও তার পাশাপাশি অন্যান্য শৃঙ্গ অভিযানের অনুমতি দেয় নেপাল।
মূলত নব্বইয়ের দশক পার করার পর থেকেই এই শৃঙ্গগুলির আকর্ষণে পর্বতারোহীদের ছুটে আসা বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে। অভিযাত্রীদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় শেরপা ও অন্যান্য সহায়কদের চাহিদাও বাড়তে থাকে। বহু ক্ষেত্রেই অভিযাত্রীদের পক্ষে স্থানীয় মানুষের তথা এই শেরপাদের ছাড়া এক পা চলাও অসম্ভব। নিজেদের রোজগারের প্রয়োজনেই তাই স্থানীয় মানুষেরা ব্যাপকহারে এই অভিযাত্রীদের সহায়কের ভূমিকা পালন করতে থাকেন।

প্রসঙ্গত, এঁদের অনেকের পরিবারেই আগে মূলত চাষাবাদ বা অন্যান্য ছোটখাটো জীবিকাই মূল রোজগারের উপায় ছিল। কিন্তু সময়ের বদলের সঙ্গে সঙ্গে, অভিযানে সহায়তা করে অর্থ উপার্জনের পথ প্রশস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই পর্বতারোহীদের সহায়তা করার কাজের দিকে ঝুঁকতে থাকেন। সারা বছরই এই সমস্ত মানুষেরা ও তাঁদের পরিবার সংসার চালানোর জন্য এই সময়ের পর্বত অভিযানগুলির দিকেই তাকিয়ে থাকেন।
এই বছর করোনা আতঙ্কের জন্য সবকিছু বন্ধ। বিদেশি পর্যটকদের আসার কোনও সুযোগ নেই। তাই মাথায় হাত শেরপাদেরও। উপায় না দেখে অনেকেই অন্যান্য ছোটখাটো কাজের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ আবার চাষাবাদের কাজ শুরু করার ভাবনায় আছেন, কেউ কেউ কাঠমাণ্ডুর পথে পা বাড়িয়েছে অন্য কাজ খোঁজার জন্য। তবে এই শ্রমজীবী মানুষদের একটা বড় অংশ এখন কর্মহীন ও আর্থিক অনটনের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছে।

নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডু থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরের ছোট শহর ভরতপুরের বাসিন্দা পাসাং শেরপা বলছিলেন, "গত বছর খুব ভাল ছিল আমাদের সিজ়ন। বহু আরোহী এসেছিলেন। আমি নিজে দু'বার এভারেস্ট আরোহণ করেছিলাম দুটো দলের সঙ্গে। আরও বেশ কয়েকটা পিক ক্লাইম্ব করেছিলাম। এবার সব স্তব্ধ। আমরা ভাবছি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাব। ওখানে গেলে তাও চাষবাস করে একটা সংস্থান করা যাবে উপার্জনের। এই পরিস্থিতি কবে কাটবে, বর্ষার পরে যে আরোহণ মরসুম তখন সব ঠিক হবে কিনা, বুঝতে পারছি না কিছুই।"
এই ক্ষেত্রে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কিছু কিছু অভিযান আয়োজক সংস্থাও। যাঁরা সারা বছর তাদের হাত শক্ত করে তোলে, এই দুঃসময়ে তাঁদের হাতে খাবার তুলে দিতে এগিয়ে এসেছে এলিট হিমালয়ান অ্যাডভেঞ্চারের মতো কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান।

এলিট হিমালয়ানের পক্ষ থেকে জানানো হয় প্রথম দফায় তারা ৬০টির মতো পরিবারকে সাহায্য পাঠিয়েছে। পরবর্তীতেও পাশে থাকার চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছে। এগিয়ে এসেছে আরও কিছু উদ্যোগী। কিন্তু তার পরেও দুশ্চিন্তার রেশ কিছুতেই কমছে না স্থানীয় এইসব মানুষের। যদি এই বছরে পর্বতারোহণ একেবারেই না হয়, কীভাবে পেট চালাবেন তাঁরা? হয়তো আবার চাষাবাদ বা মালবাহকের কাজেই ফিরতে হবে তাঁদের!