
শেষ আপডেট: 17 May 2019 04:46
নির্মল পুর্জা[/caption]
"আমাকে আর মিংমা ডেভিড শেরপাকে ১৪ মে, সকাল ১১ টায় হেলিকপ্টারে করে নামিয়ে দেওয়া হল কাঞ্চনজঙ্ঘা বেসক্যাম্পে। ধৌলাগিরির খারাপ আবহাওয়ার সঙ্গে লড়তে হয়েছে আমাদের তার আগেই। পাঁচ দিন কার্যত ঘুম নেই। কিন্তু আমরা বেসক্যাম্প থেকে ওই দিনই দুপুর একটায় সামিট পুশ শুরু করি। এবং ১৫ মে সকাল ১১:১৯ মিনিটে কাঞ্চনজঙ্ঘার শৃঙ্গে আরোহণ করি।
নামার সময়ে, ৮৪৫০ মিটারের মাথায় আমাদের সঙ্গে দেখা হয় এক জন ভারতীয় পর্বতারোহীর (পরে জানা যায় তিনিই বিপ্লব বৈদ্য) ও তাঁর গাইডের। দু'জনেরই সাপ্লিমেন্ট অক্সিজেন ফুরিয়ে গেছে। রেসকিউ প্রয়োজন। আমরা আমাদের অতিরিক্ত অক্সিজেন যা ছিল, ওঁদের দিলাম। এবং রেসকিউ মিশন শুরু করলাম।
আমরা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক নীচের ক্যাম্পে অর্থাৎ ক্যাম্প ফোরে থাকা ব্যাক-আপ টিমকে অনুরোধ করলাম অতিরিক্ত অক্সিজেন পাঠিয়ে সাহায্য করার জন্য। বিপ্লব ও তাঁর গাইডকে নিয়ে কোনও রকমে আরও ১৫০ মিটার নামার পরে আমরা আরও এক পর্বতারোহীকে (কুন্তল কাঁড়ার) দেখতে পেলাম। যাঁকে তাঁর গাইড ও টিম ফেলে চলে গেছে!
বিপ্লব ও কুন্তল দু'জনেই 'পিক প্রোমোশন' পর্বতারোহণ আয়োজক সংস্থার ক্লায়েন্ট। আমাদের কাছে আর অতিরিক্ত ছিল না অক্সিজেন। আমি তখন কুন্তলকে আমার নিজের অক্সিজেন দিলাম, এবং রেসকিউ মিশন চালিয়ে যেতে থাকলাম। বিপ্লব আর কুন্তলকে নিয়ে আরও কিছু মিটার নামার পরে আমাদের গাইড গেশমান তামাংকে তাঁর অক্সিজেনও দিয়ে দিতে হল।
[caption id="attachment_105107" align="aligncenter" width="800"]
বামদিকে বিপ্লব বৈদ্য, ডানদিকে কুন্তল কাঁড়ার[/caption]
শেষমেশ দুপুর আড়াইটা নাগাদ দেখা গেল, আমার টিমের সমস্ত অক্সিজেন ওই দুই পর্বতারোহীকে দিয়ে নীচে নামানোর চেষ্টা করছেন।
কিন্তু আপনাদের পক্ষে বোঝা সত্যি মুশকিল, যে ৮৪৫০ মিটার ওপরে অক্সিজেন ছাড়া এই রেসকিউ মিশন চালানো কতটা কঠিন। প্রত্যেক ১৫-২০ মিনিট অন্তর আমি রেডিও মারফত অক্সিজেন ও সাহায্য চেয়ে গেছি ক্যাম্প ফোরে। আমাকে বলাও হয়েছিল, তিন জন শেরপা ওপরে উঠছে অক্সিজেন নিয়ে, কিন্তু সেটা হয়নি। যত বার রেডিওতে মেসেজ পাঠিয়েছি, আমাকে একই কথা বলা হয়েছে বারবার।
এই ঘটনা আমার টিমের সদস্যদের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলল। সকলের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যাচ্ছিল। গাইড গেশমানের সামান্য HACE-এর (High-altitude cerebral oedema, মস্তিষ্কে জল জমে যাওয়া) লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তাঁর পা জমতে শুরু করেছে। আমি ওঁকে নীচে পাঠিয়ে দিলাম।
এইখানে এসেই খুব দুঃখজনক ভাবে আমরা হারালাম কুন্তলকে। কারণ অতিরিক্ত অক্সিজেন নিয়ে কোনও ব্যাক-আপ টিম এল না। তত ক্ষণে আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে, বাতাসের গতিবেগ বাড়ছে। কিন্তু আমরা সর্বোত্তম চেষ্টায় বিপ্লবের রেসকিউ চালিয়ে যেতে লাগলাম।
এ বার আমাদের সব চেয়ে শক্তিশালী শেরপা মিংমার পালা। আমি এত বছরের পর্বতারোহণ জীবনে কখনও শুনিনি, মিংমার HACE-এর লক্ষণ দেখা দিয়েছে। কিন্তু সেটাই হল। এবার ভয় করছিল। আমরা আরও একটা দুর্ঘটনা হতে দিতে পারব না। তখনও পর্যন্ত ওপরে কোনও সাহায্যই আসছে না। আমি মিংমাকেও নীচে পাঠিয়ে দিলাম, অবস্থা ভাল নয় দেখে। কিন্তু আমি আর দাওয়া তখনও হাল ছাড়িনি। অক্সিজেন ছাড়াই বিপ্লবের রেসকিউ মিশন চলাতে লাগলাম। শেষমেশ ব্যর্থ হয়েছি আমরা। শেষরক্ষা হয়নি। বিপ্লবও বাঁচল না।
তখন কাঞ্চনজঙ্ঘায় প্রায় ৫০ জন পর্বতারোহী ছিলেন। দু'জনেরই জীবন বাঁচানো যেত, যদি কেউ একটু সাহায্যের সাহস দেখাতেন। আমাদের মিশন পসিবেল টিমের কেবল প্রয়োজন ছিল একটু সাহায্যের। কিন্তু মেলেনি কিছুই।"
[caption id="attachment_104866" align="aligncenter" width="960"]
টিম: প্রোজেক্ট পসিবেল[/caption]