
শেষ আপডেট: 9 January 2024 18:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্বভাবে ছিলেন দুরন্ত প্রকৃতির। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাদামাটিতে ফুটবল খেলে বেড়ানোর এক অমোঘ টান ছিল। সেই আকর্ষণ দমন করতে হয়েছিল দাদু উস্তাদ নিসার হুসেন খানের কঠোর অনুশাসনে। বিকেল গড়ালেই ফুটবলটাকে তুলে রেখে বসতেই হত তানপুরা নিয়ে। পরবর্তী সময়টা শুধুই আলাপ-বিস্তারে আত্মমগ্ন হওয়ার। এভাবেই সুরের জগতে রশিদ খানের অবগাহনের সূচনা। অন্যথা হলেই দাদুর কাছে বকা খাওয়ার পালা।
ছোটবেলার দিনগুলির স্মৃতি কখনই ফিকে হয়নি। কঠিন রামপুর সহসওয়ান ঘরানা আত্মস্থ করতে ঠিক কতটা পরিশ্রম করতে হত সেই গল্প শুনিয়েছেন বহুবার। একটা তানকে সঠিক ভাবে গলায় তুলতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন চলত রেওয়াজ। যতক্ষণ না সুরটা ঠিক জায়গায় লাগে।
উত্তরপ্রদেশের বরেলির বাদাঁয়ু গ্রামে জন্ম। পারিবারিকভাবে রামপুর-সহসওয়ান ঘরানার উত্তরসাধক তিনি। বাবা হামিজ রেজা খানও ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর কাছে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু উস্তাদ রশিদ খানের। ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত মা শাখারী বেগম ঘিরে থাকতেন রশিদকে। বাবার কাছে প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার পর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সমুদ্রস্নানে তাঁর হাত ধরেছিলেন দাদু উস্তাদ নিসার হুসেন খান। দাদুর তালিমেই সুরের জগতে অনায়াস বিচরণের জন্য নিজেকে তৈরি করেছিলেন রশিদ খান।
মাত্র এগার বছর বয়সে রশিদ খান মঞ্চে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। সেই শৈশবেই তাঁর আলাপ-বিস্তার নজর কেড়েছিল গুণীজনদের। ১৯৮০ সালে দাদুর হাত ধরেই চলে এসেছিলেন কলকাতায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল এই কলকাতারই আইটিসি সঙ্গীত একাডেমিতে। পরবর্তীতে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে এই শহরই প্রথম প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তাঁকে। মূলত রামপুর সহসওয়ান ঘরানার শিল্পী হলেও নিজেকে কখনই বেঁধে ফেলেননি তিনি। গোয়ালিয়র ঘরানা-ইন্দোর ঘরানাতেও বিচরণ করেছেন অনায়াসে। মূলত খেয়াল শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। তবে দাদু উস্তাদ নিসার হুসেন খানের তারানা গায়নশৈলিকেও আত্মস্থ করেছিলেন নিজের মতো করে। নিয়মের নিগড়ে রাগের সুনিয়ন্ত্রিত চলনে নিজেকে বেঁধে রাখা নয়, বরং প্রতিটি আলাপে আবেগের ছোঁয়ায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের নিয়মে। এভাবেই কখন যেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে নিজেই একটা ঘরানা তৈরি করেছেন।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে আপামরের করতে বারবার এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। পরীক্ষা- নিরীক্ষা- গবেষণা চলত নিরন্তর। আমির খসরুর “নায়না পিয়া সে” গানটিকে তিনি সুফি গায়কিতে গেয়েছেন। ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতকে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাথে মিলিয়েছিলেন লুই ব্যাংকসের সাথে যুগলবন্দি করে। নচিকেতার সঙ্গে গেয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। কণ্ঠ দিয়েছেন বেশ কিছু সিনেমার গানেও। আরও পথ চলা বাকি ছিল। সে সমস্তই অসমাপ্ত থেকে গেল ১৯৬৮ র জাতকের অকালপ্রয়াণে।