মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, "ক্ষমতায় আসার আগে জনগণকে আমরা কী বলেছিলাম, আর এই সময়ে আমরা কী কী কাজ করেছি, সেটা মানুষকে জানানো আমাদের নিজেদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে মনে করি। তাই এই রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করা হল।"

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 2 December 2025 18:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছর ঘুরলেই রাজ্যের বিধানসভা ভোট। তবে এসআইআর ইস্যুতে ইতিমধ্যেই বাংলায় যেন ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে। ক্রমেই চড়ছে রাজনীতির পারদ। এমন আবহে নবান্নের প্রশাসনিক বৈঠক থেকে (administrative meeting, Nabanna) বিগত সাড়ে ১৪ বছরে তাঁর সরকারের কাজের খতিয়ান (state's 14-year development record) তুলে ধরলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Chief Minister Mamata Banerjee)।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, "ক্ষমতায় আসার আগে জনগণকে আমরা কী বলেছিলাম, আর এই সময়ে আমরা কী কী কাজ করেছি, সেটা মানুষকে জানানো আমাদের নিজেদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে মনে করি। তাই এই রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করা হল।"
২০১১ থেকে ২০২৫। তখতে বসার পর থেকেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, কৃষক বন্ধু, পড়ুয়াদের ক্রেডিট কার্ড-সহ মোট ৯৪টি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু করেছে সরকার। কীভাবে রাজ্যের স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ করে চলেছে এদিনের বৈঠকে সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠকে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, জিএসটি বাবদ কেন্দ্র রাজ্যেরও টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। তারপরও রাজ্যের প্রাপ্য প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। তা সত্ত্বেও নিজস্ব উদ্যোগে আমরা কর্মশ্রী, বাংলার বাড়ি-সহ একাধিক সামাজিক প্রকল্প চালু রেখেছি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, "গ্রামীণ সড়ক, গ্রামীণ আবাস যোজনা,১০০ দিনের কাজ এই প্রকল্পগুলিতে আমরা পর পর চারবছর এক নম্বরে ছিলাম। তাই তো ওরা বাংলার টাকা বন্ধ করে রেখেছে।"
একই সঙ্গে কেন্দ্রের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আশা করব, আমাদের প্রাপ্য টাকাটা দেবেন। ইলেকশন তো চলে এল। আর কবে টাকা দেবেন? ফেব্রুয়ারিতে দেবেন? যাতে কাজ করতে না পারি। তারপর আবার টাকাটা ফেরৎ নিয়ে নেবেন। চালাকি টা আমরাও বুঝি!"
বিরোধীরা কথায় কথায় বলেন, বাংলায় উন্নয়ন হয়নি। পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, একদিকে রাজ্যের উন্নয়নের খতিয়ান অন্যদিকে কেন্দ্রের বঞ্চনার প্রসঙ্গ টেনে পরোক্ষে বিরোধীদের তোলা সেই অভিযোগেরও জবাব দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিন অনুষ্ঠানের শুরুতে ভিডিও প্রকাশ করে ১৪ বছরে সরকারের 'উন্নয়নের পাঁচালি' তুলে ধরা হয়। উন্নয়নের পাঁচালীর ওপর সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী ইমন চক্রবর্তী। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, "আগেকার দিনে সন্ধ্যেয় গ্রামে পাঁচালি পড়া হত। গ্রামের দিকে এখনও হয়তো হয়, হারিয়ে যেতে বসা সেই গৌরবকে ধরে রাখতে এমন পাঁচালির ভাবনা।"
সরকারি তথ্য অনুযায়ী-রাজ্যের উন্নয়নের পাঁচালীর বিবরণ নীচে দেওয়া হল।
সাড়ে ১৪ বছরে রাজ্যের জিএসডিপি বেড়ে হয়েছে ২০ লক্ষ ৩১ হাজার কোটি টাকা। রাজ্যের কর আদায় বেড়েছে ৫.৩৩ গুণ। দারিদ্র সীমার বাইরে আনা হয়েছে ১ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষকে। বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ কমেছে। কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে ৯.১৬ গুণ। কৃষক বন্ধু প্রকল্পে ১ কোটি ৬০ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছে।
শিল্পে দুই কোটির বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। দু'লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেউচা পাচামিতে এক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। শুধুমাত্র স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রিতে এক কোটি ৩০ লক্ষের বেশি মানুষ কাজ করেন। ৬৬০টির বেশি এমএসএমই ক্লাস্টার গঠন করা হয়েছে। ৪২ লক্ষ ছেলেমেয়েকে স্কিল ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে
এক কোটি মহিলা কন্যাশ্রী পাচ্ছেন। ৩১ লক্ষ ৭৭ হাজার পরিযায়ী শ্রমিক যাদের অনেককে অত্যাচার করা হয়েছে তাদের ৫০০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। লক্ষীর ভান্ডার পাচ্ছেন ২ কোটি ২১ লক্ষ মহিলা। এজন্য এখনও পর্যন্ত ৭৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আমাদের বাজেট ১৪ বছরে ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবারকে এর আওতায় আনা হয়েছে। আইসিসিইউ মডেলে ১০১ টা স্বাস্থ্য বন্ধু ভ্যান ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে, আরো হাতে রয়েছে ১১০ টা, সবমিলিয়ে ২১১ টা এমন ভ্যান।
বাংলার বাড়ি প্রকল্পে ৬৭ লক্ষ ৬৯ হাজার বাড়ি অলরেডি দেওয়া হয়েছে। আরও ১৬ লক্ষ দেওয়া হবে। এছাড়াও বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা প্রায় এক কোটির কাছাকাছি হয়ে যাবে।
পথশ্রী প্রকল্পে মোট ১ লক্ষ ৯০ কিমি রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। গঙ্গাসাগরের জন্য বুড়িগঙ্গা নদীর উপর ১৭০০ কোটি টাকা দিয়ে গঙ্গাসাগর সেতু করা হচ্ছে। এটার টেন্ডার ফাইনাল হয়ে গেছে। রাজ্যের ৯ কোটি মানুষ খাদ্য সাথী পায়। এরজন্য রাজ্যের খরচ হয় ১ কোটি টাকা। দুয়ারে রেশন ৭ কোটি ৪১ লক্ষ মানুষ পায়। সংখ্যালঘু উন্নয়নে ৪.৮৫ কোটি ছাত্র-ছাত্রীরা আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। দশ গুন বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে এই দফতরে। ২০১১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ৬ কোটি ৫৬ লক্ষ পাট্টা দেওয়া হয়েছে। সব উদ্বাস্তু কলোনিগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের দাবি, শুধু ২০২৫ এর অক্টোবরে ২৪ কোটি দেশি বিদেশি পর্যটক এসেছে বাংলা। পর্যটকের সংখ্যায় দেশের মধ্যে বাংলা এখন দ্বিতীয়।
নবান্ন সভাঘরের এই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব-সহ প্রতিটি দফতরের মন্ত্রী, সচিব, আমলা, প্রতিটা জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার।