দ্য ওয়াল ব্যুরো: গতিচ্যুত হয়েছিল চন্দ্রযানের ল্যান্ডার বিক্রম। চাঁদের দক্ষিণ পিঠে নামার সময় গতিবেগের গলদের কারণেই টার্গেট থেকে ৫০০ মিটার দূরে মুখ থুবড়ে (হার্ড ল্যান্ড) পড়ে বিক্রম। লোকসভার প্রশ্নোত্তর পর্ব চলাকালীন এমনটাই বললেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং।
৬ সেপ্টেম্বর রাতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরেই ল্যান্ডার বিক্রমের সঙ্গে সবরকম যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। চাঁদের কক্ষপথে ঘুরতে থাকা অরবিটার রেডিও সিগন্যাল পাঠালেও তাতে ধরা দেয়নি ল্যান্ডার বিক্রম। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কথায়, অবতরণের প্রথম পর্যায় গতিবেগের ভারসাম্য বজায় ছিল, অর্থাৎ চন্দ্রপৃষ্ঠের ৩০ কিলোমিটার থেকে ৭.৪ কিলোমিটার দূরত্বে বিক্রমের গতিবেগ স্বাভাবিক ভাবেই ১,৬৮৩ মিটার/সেকেন্ড থেকে কমে যায় ১৪৬ মিটারে। সমস্যা তৈরি হয় দ্বিতীয় পর্যায়ে গিয়ে।
মন্ত্রীর কথায়, “চাঁদের মাটির খুব কাছাকাছি গিয়ে গতিবেগে গলদ হয়ে যায় বিক্রমের। যে নির্দিষ্ট মাত্রার বেগ তার সিস্টেমে আপডেট করা ছিল সেটা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে বিক্রম। যে জায়গায় তার ল্যান্ড করার কথা ছিল তার থেকে অন্তত ৫০০ মিটার দূরে ছিটকে পড়ে।”
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতেই ল্যান্ড করেছে বিক্রম, এটা নিশ্চিত করেছে ইসরো। এখন দক্ষিণ মেরুর ঠিক কোথায় বিক্রম ল্যান্ড করেছে বা সে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে কি না, সেই বিষয়ে কোনও রকম তথ্য ইসরোর তরফে জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, চাঁদের দক্ষিণ পিঠে
‘হার্ড ল্যান্ড’
(Hard Landing) করেছে বিক্রম। চন্দ্রযান ২-এর অরবিটারে তোলা তাপচিত্র বা
থার্মাল ইমেজে (Thermal Image) দক্ষিণ মেরুর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ধাতব বস্তুর খোঁজ মিলেছে, যার থেকেই অনুমান করা হচ্ছে বিক্রম সেখানে থাকলেও থাকতে পারে। বিক্রমের অ্যান্টেনার সঙ্গে রেডিও যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছে অরবিটার।
চাঁদের পিঠে ঠিক কীভাবে বিক্রম ল্যান্ড করতে পারে এই প্রসঙ্গে দ্য ওয়ালের তরফে
কলকাতার ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের ডিরেক্টর, বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, চাঁদের চারপাশে উপবৃত্তাকার কক্ষপথ ধরে ঘুরতে ঘুরতে দূরত্ব কমিয়েছিল বিক্রম। পৌঁছেছিল চাঁদের একদম কাছাকাছি। ৬ সেপ্টেম্বর রাতে অবতরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর,
৩৫*১০১ কিলোমিটার কক্ষপথ ধরে সোজা চাঁদের মাটিতে নেমে আসার কথা ছিল ল্যান্ডার বিক্রমের। এই ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব পার করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোগ্রামিং ল্যান্ডারের মধ্যে করে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সোজা নামতে নামতে শেষ ৫ কিলোমিটারে মুখ ৯০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে (Vertical) চাঁদের পিঠে নামার কথা ছিল বিক্রমের। এই পর্যায়ে গতি এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কথা যাতে ভার্টিকালি ঘুরে গিয়ে পালকের মতো চাঁদের মাটিতে নামতে পারে ল্যান্ডার। যাকে বলে
সফট ল্যান্ডিং (Soft Landing)। এই ৯০ ডিগ্রি রোটেশন হয়নি। বরং ২.১ কিলোমিটার থেকে পুরোপুরি উল্টে গিয়ে সজোরে চাঁদের মাটিতে ধাক্কা খেয়েছে সে।
[caption id="attachment_160853" align="aligncenter" width="768"]
সফট ল্যান্ডিং-এর আগে ঠিক কী কী হয়েছিল, রেখাচিত্র এঁকে বুঝিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী[/caption]
বিক্রমের চার পাশে চারটি থ্রাস্টার ঠিক ভাবে কাজ করতে পারেনি সেটাও একটা বড় কারণ। গণ্ডগোল হয় মাঝের অর্থাৎ সেন্ট্রাল থ্রাস্টার চালু করার সময়তেও। গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল তারই। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে ল্যান্ডারকে চাঁদের মাটিতে পৌঁছে দেওয়া। প্রোগ্রামিং ছিল ঠিক এই ভাবে—৩৫ কিলোমিটার উচ্চতায় ৫৬০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগ নিয়ে বিক্রম নামতে শুরু করে। শেষ সাড়ে সাত কিলোমিটারে তার বেগ হওয়া উচিত ছিল ৫৫০ কিলোমিটার/ঘণ্টা। ক্রমশ কমতে কমতে ৫ কিলোমিটারে এসে প্রায় ১০০ কিলোমিটার/ঘণ্টা। আর ঠিক যে দূরত্ব থেকে বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছে সেই ২.১ কিলোমিটারে এসে গতি অনেকটা কমে হওয়া উচিত ছিল ১ মিটার/সেকেন্ডেরও কম অর্থাৎ ঘণ্টায় ৩.৬ কিলোমিটারের কম। সেটা হয়নি। দেখা গেছে, হরাইজন্টালে তার বেগ ছিল ৪৯ মিটার/সেকেন্ড এবং ভার্টিকালি ৫৯ মিটার/সেকেন্ড।
https://www.four.suk.1wp.in/news-isros-chandrayaan-2-the-reasons-why-vikram-cant-soft-land-on-moons-south-pole-explains-astrophysicist-sandip-chakraborty/