
শেষ আপডেট: 4 February 2024 00:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। ভারতে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। নতুন সমীক্ষায় এমনটাই দাবি করেছিল ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)। ক্যানসার সারাতে নানারকম ওষুধ ও থেরাপি আবিষ্কার করছেন বিজ্ঞানীরা। সেইসব ওষুধ কতটা কার্যকরী হচ্ছে তার ট্রায়াল চলছে বিশ্বজুড়েই। এর মধ্যেই বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখছেন, কীভাবে ক্যানসার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যানসার কোষ ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে বিভাজিত হয়ে সংখ্যায় বাড়তে থাকে এবং কীভাবে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়ায়, সেই প্রক্রিয়ার খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির (University of Southern California) গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্যানসার কোষ কীভাবে মানব শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, কোন পথে অগ্রসর হয় তার খোঁজ পাওয়া গেছে। এই খোঁজ ভবিষ্যতে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং থেরাপি আবিষ্কারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেবে বলেই দাবি। 'প্রসিডিংস অব ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস' মেডিক্যাল জার্নালে এই গবেষণার ব্যাপারে লিখেছেন সাদার্ন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা।

ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যামি এস লি তাঁর ল্যাবোরেটরিতে দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার কোষ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি এক আশ্চর্য তথ্য পেয়েছেন। বিজ্ঞানী বলছেন, ক্যানসারের কারণ হল শরীরের সুস্থ কোষ রূপান্তরিত হয়ে টিউমারে পরিণত হওয়া। সেটা সহজ পদ্ধতি নয়। শরীরেরও নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে। সেখানে হঠাৎ করে সুস্থ কোষের উপরে হামলা হলে, শরীরের সুরক্ষা ব্যবস্থা তাকে বাধা দেবে। শ্বেত রক্তকণিকার ইমিউন উপাদানগুলো একজোট হয়ে লড়াই করবে। তাই ক্যানসার (Cancer) কোষ চুপিচুপি চালাকি করে সুস্থ কোষগুলিকে আক্রমণ করে। একবারে নয়। আগে বন্ধু সেজে ভেতরে ঢোকে তারপর ফালাফালা করে দেয় সুস্থ কোষকে। এই প্রক্রিয়া এতটাই নিখুঁতভাবে ও ধীরে ধীরে হয় যে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে শরীরে।

ক্যানসারের (Cancer) আসল অস্ত্র হল GRP78 প্রোটিন। মারণাস্ত্রও বলা যায়। এই প্রোটিনকে সুস্থ কোষের একেবারে নিউক্লিয়াসে সেঁধিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। আর সেই কাজটাই চালাকি করে গোপনে করে ক্যানসার কোষ। এই ধরনের প্রোটিন কোষের কোষের এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকিউলামে থাকে। এমনিতে এই প্রোটিন ততটা ক্ষতি করে না। কিন্তু ক্যানসার যখন হয় তখন এই প্রোটিনই সবচেয়ে আগে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সুস্থ কোষের প্রোটিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে সেটি একেবারে কোষের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারপর সুযোগ বুঝে হুড়মুড়িয়ে ঢোকে নিউক্লিয়াসে। একবার কোষের নিউক্লিয়াসে ঢুকে পড়লেই তার হাতে সেই কোষের নিয়ন্ত্রণ শক্তি চলে আসে। তখন ইচ্ছামতো জিন বদলে সেই সুস্থ কোষকে ফালাফালা করে দেয়। নষ্ট হয়ে যাওয়া কোষ তখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে খেয়ালখুশি মতো বিভাজিত হতে থাকে এবং টিউমার কোষে বদলে যায়। এই টিউমার তখন তার সেই প্রোটিনকে আবার আশপাশের সুস্থ কোষে চালান করে দেয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, একবার যদি সুস্থ কোষ নষ্ট হতে শুরু করে, তাহলে আশপাশের কোষগুলিতেও তার প্রভাব পড়ে। শুরুটা ধীরে হয় কিন্তু তারপরের প্রক্রিয়াটা দ্রুতগতিতে হতে থাকে। যতক্ষণে শরীরের প্রতিরক্ষা সিস্টেমে খবর যায়, ততক্ষণে ক্যানসার (Cancer) ছড়িয়ে পড়ে অনেকটাই। ফলে শরীর নিজে থেকে আর ক্যানসার কোষগুলির সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না। তখন বাইরে থেকে সেই কোষ নষ্ট করতে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি করতে হয়, অথবা ওষুধ-ইঞ্জেকশন দিয়ে সেই কোষ বা কোষের রাক্ষুসে প্রোটিনকে নষ্ট করতে হয়।
ফুসফুসে ক্যানসার (Lung Cancer) কীভাবে ছড়ায় সেটা পরীক্ষা করতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা ক্যানসার কোষের এই চালাকি ধরে ফেলেছেন। বিজ্ঞানী লি বলছেন, কোষের ID2 প্রোটিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতায় GRP78 প্রোটিন। এই দুই প্রোটিন মিলে গেলেই তাণ্ডব শুরু হয়। বদলে যেতে থাকে সুস্থ কোষ। রূপান্তরিত (Genetic Mutation) হতে থাকে কোষের ডিএনএ বা জিন। আর বদলে যাওয়া জিনই ক্রমশ শরীরের শত্রু হয়ে ওঠে।
গবেষকরা বলছেন, ক্যানসার চিহ্নিত করাটাই আসল কাজ। সঠিক সময় ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসায় রোগ সেরে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকেই। কিন্তু ডায়াগনসিসেই এত দেরি হয়ে যায় যে ক্যানসার কোষগুলি বাড়তে বাড়তে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একেবারে নষ্ট করে দেয়। তখন আর কিছু করার থাকে না। কিন্তু যদি আগে থেকেই রোগের কারণ ও তার গতিপথ ধরা যায় তাহলে ক্যানসার নির্মূল করার চেষ্টা করতে পারেন চিকিৎসক-গবেষকরা।