দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওষুধের গুণমান যেমন বিচার করা হবে, তেমনি তার সঠিক বন্টনও হবে। দামও থাকবে সাধ্যের মধ্যেই। থেরাপির ক্ষেত্রেও ওষুধের দাম ও কার্যকারিতার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হবে। ‘ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট’ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা হবে সঠিক শৃঙ্খলে বাঁধা। এই নিয়মনীতিকেই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ফার্মাকোইকনমিক্স’ । বিশ্বের অনেক দেশেই এখন ফার্মাকোইকনমিক্সের চর্চা। ভারতও সেই পথেই হাঁটছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার এই নিয়মনীতি সংক্রান্ত বিষয়েই নতুন কর্মসূচী নিতে চলেছে ক্যাডিলা গ্রুপ।
ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর ক্লিনিকাল রিসার্চ (ISCR)-এর তত্ত্বাবধানে ফার্মাকোইকনমিক্স (Pharmacoeconomics) নিয়ে ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে দেশের প্রথম সারির ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ক্যাডিলা গ্রুপ। দেশের ডেপুটি ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল ডক্টর রুবিনা বোসের নেতৃত্বে এই ওয়েবিনারে ফার্মাকোইকনমিক্সের রূপরেখা তৈরি হতে পারে। এই কাজে ক্যাডিলা গ্রুপের পাশে রয়েছেন পোলান্ড সরকারে স্বাস্থ্য দফতরের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং ফার্মাকোইকনমিক্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মার্সিন চেক। তাছাড়া ফার্মাকোইকনমিক্স কি এবং তার ভূমিকা কেমন সেই নিয়ে এই ওয়েবিনারে বক্তব্য রাখবেন কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালের ক্লিনিকাল ডিরেক্টর ডক্টর শুভ্রজ্যোতি ভৌমিক, এসজিটি ইউনিভার্সিটির ডিরেক্টর এবং রিসার্চ হেড ডক্টর বকুলেশ খামার ও একজিকিউটিভ ডিরেক্টর ডক্টর অমোঘ দেব রাই।
ফার্মাকোইকনমিক্স হল এমন এক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি যেখানে ওষুধের দাম, তার বন্টন, কার্যকারিতা, এবং রোগীর শরীরে তার উপকারিতার ভিত্তিতে একটা সুস্পষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ওষুধের মধ্যে তুলনা করে কোনটা কোন রোগীর উপরে প্রয়োগ করা যাবে এবং কীভাবে সেই ওষুধের দাম সাধ্যের মধ্যে রাখা যাবে সেই রূপরেখাও তৈরি হয় এই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে।
মূলত চারটি বিষয়ের উপর খেয়াল রাখা হয়। ওষুধের দাম, গুণমান, কার্যকারিতা এবং রোগীর শরীরে তার প্রভাব। এই সবদিক খতিয়ে দেখেই ওষুধের বিতরণ করা হয় সার্বিকভাবে। শুধু তাই নয় ওষুধ বন্টনের সময়েও খেয়াল রাখা হয় কীভাবে বহুমানুষের মধ্যে সেই ওষুধের প্রয়োগ সম্ভব হবে। সহজভাবে বলতে গেলে, ফার্মাসির সঙ্গে অর্থনীতি বা ইকোনমিক্সকে মিলিয়ে দেওয়া হয় এই পদ্ধতিতে। প্রথমে ওষুধের গুণমান ও তার কার্যকারিতা বিচার করা হয়, তারপর সেই ওষুধের সমবন্টনের রূপরেখা তৈরি হয় বিজ্ঞানসম্মত উপায়। ফার্মাকোইকনমিক্সের এটাই হল মূল কথা।
এবার দেখে নেওয়া যাক এই পদ্ধতির কী কী দিক রয়েছে।
১) কস্ট-মিনিমাইজেশন অ্যানালাইসিস ২) কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস ৩) কস্ট-এফেক্টিভ বা ইউটিলিটি অ্যানালাইসিস।
ধরা যাক, কোনও নতুন ড্রাগ এসেছে বাজারে। এবং সেই ওষুধের চাহিদা তুঙ্গে। স্বভাবতই বিভিন্ন হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে সেই ওষুধের থেরাপি চড়া দামেই হবে। ফার্মাকোইকনমিক্স বিশেষজ্ঞরা তখন ঠিক করবে ওষুধের দাম কীভাবে সাধ্যের মধ্যে রাখা যায় যাতে হাসপাতালের লাভও থাকবে আবার রোগীর পরিবার সেই ব্যয়ভার বহনও করতে পারব। অনেকক্ষেত্রেই কোনও লাইসেন্স পাওয়া ওষুধকে সরকারি ছাতার তলার এনে ভর্তুকির ব্যবস্থাও করতে পারে ফার্মাকোইকনমিক্স। যেমন, কোনও ফার্মাসি বা ড্রাগ নির্মাতা সংস্থার থেকে ওষুধ কিনে নিল সরকার। এবার কম দামে জনসাধারণের মধ্যে তা বন্টন করা হল। ওষুধের কার্যকারিতা এবং লাভ দুটোই মাথায় রেখে সে গাইডলাইন তৈরি হতে পারে এই প্রক্রিয়ায়।
আবার ধরা যাক, কোনও জটিল রোগের থেরাপি হচ্ছে। একই রকম গুণমানের দু’রকম ওষুধ রয়েছে। কোন ওষুধের প্রয়োগ কোন রোগীর উপর করলে তার কার্যকারিতা থাকবে এবং থেরাপির খরচেও সুবিধা হবে সেটা খতিয়ে দেখবে ফার্মাকোইকনমিক্স। তবে আর্থিক সুবিধা নয়, ওষুধের গুণগত মান, তার কার্যকারিতা এবং অবশ্যই রোগীর শরীরে তার প্রভাব গুরুত্ব পাবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক দামি ওষুধ তৈরি হচ্ছে যার দাম আকাশছোঁয়া থাকার কারণে থেরাপিতে প্রয়োগ সবসময় সম্ভব হয়না। এই সঙ্কট কীভাবে কাটানো যায় তারই চেষ্টা করবে ফার্মাকোইকনমিক্স। পিছিয়ে পড়া এলাকাতেও যাতে ওষুধের সঠিক বিতরণ হয় এবং উন্নতমানের থেরাপি পৌঁছে দেওয়া যায় তার গাইডলাইন তৈরি করা যাবে এই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে।
১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম ফার্মাকোইকনমিক্স নিয়ে চর্চা শুরু হয়। ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট এবং চিকিৎসাপদ্ধতিকে একটা সুর্নিদিষ্ট নিয়মে বাঁধতে এই প্রক্রিয়াতে সম্মতি দেয় সে দেশের সরকার। তৈরি হয় ‘ফার্মাসিউটিক্যাল বেনিফিট অ্যাডভাইজরি কমিটি ‘ (PBAC) । পুরনো ওষুধের সঙ্গে নতুন ওষুধেরও তালিকা তৈরি হয় যা সরকারি সহযোগিতায় খুব দামে বিক্রি হবে ফার্মাসিগুলোতে। এই পদ্ধতির সুবিধা দেখে কানাডা, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ব্রিটেনেও ফার্মাকোইকনমিক্সের চল শুরু হয়। এবার ভারতও সেই পথে হাঁটতে চলেছে।