দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্যাব আমাক নালাগে... নালাগে! নালাগে! অর্থাৎ, আমাদের ক্যাব চাই না। চাই না, চাই না।
উত্তর-পূর্ব ভারতের একটা বড় অংশ এখন এই স্লোগানেই জমজমাট। প্রতিবাদের ভাষা অনেক সময়েই কোনও পূর্বসূচি মেনে তৈরি হয় না। সে ভাষা তৈরি করে দেয় আন্দোলন নিজেই। কেন্দ্রীয় সরকারের আনা নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদে অসম থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনেও ঠিক তাই হয়েছে। পরিচিত স্লোগান ছাপিয়ে চিৎকৃত হয়েছে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। ক্যাব আমাক নালাগে... নালাগে!
আর ক'দিন পরেই খ্রিস্টমাস। উৎসবের মরসুম। উত্তর-পূর্বের আনাচকানাচ এ সময়ে সেজে ওঠার কথা ছিল আলোয়, রঙে, গানে। হাজার রকমের স্থানীয় পার্বণ উদযাপন করতে পথে নামার কথা ছিল হাসিখুশি মানুষের। কিন্তু তার বদলে এবার গোটা এলাকা থমথম করছে। নাগরিকত্ব বিল নিয়ে অসমে শুরু হওয়া অশান্তির আঁচ পৌঁছে গেছে মেঘালয়, শিলংয়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বড় অংশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে।
গোটা এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। মোতায়েন করা হয়েছে সেনা। একসময়ে দোকানবাজারে জমজমাট ছিল যে এলাকাগুলি, সেখানেই পড়ে রয়েছে টিয়ারগ্যাসের ফাঁকা শেল, বাঁশ, পোড়া ছাই। আর সে সবের মধ্যেই বারবার চাপা গলায় শোনা যাচ্ছে, মন্ত্রের মতো মানুষ উচ্চারণ করছেন, "জয় জয় অসম"।

একটা সময়ের পরে গলার জোর বাড়ে। উচ্চকিত প্রতিবাদে ছেয়ে ওঠেন প্রতিবাদী আন্দোলনকারীরা। চিৎকার করে স্লোগান তোলেন: ক্যাব আমাক নালাগে... নালাগে! নালাগে! অর্থাৎ, আমাদের ক্যাব চাই না। চাই না, চাই না।
প্রতিবাদে দিকে দিকে পথ অবরোধ করেছেন স্থানীয় মানুষ। জ্বালিয়েছেন টায়ার। কড়া শীতে সেই টায়ারের আগুনেই উষ্ণতা পোহানোর কাজ করছেন রাতভর জেগে থাকা মানুষগুলো। তার মধ্যেই ক্ষণে ক্ষণে বুলেটের শব্দে কেঁপে উঠছে চারপাশ। সেনাবুটের শব্দে ভারী হয়ে আছে বাতাস।
পুলিশের গুলিতে বৃহস্পতিবার তিন জন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
গুয়াহাটির লাসিতনগরে গুলি চালানোয় মৃত্যু হয় দীপাজ্জ্বল দাসের। তিনি গুয়াহাটির সৈনিক ভবনের ক্যান্টিনের কর্মী। নিহত যুবকের বাড়ি অসমের ছয়গ্রামে।
গুয়াহাটিরই হাতিগাঁও এলাকার শঙ্করপথে পুলিশকে লক্ষ্য করে আন্দোলনকারীরা টানা পাথর ছু়ড়তে শুরু করলে এক সময় গুলি চালায় পুলিশ। তাতে আরও এক আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। তৃতীয় বার গুলি চালানো হয়েছে গুয়াহাটিরই বৈশিষ্ট্যের নতুন বাজারে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঘটনায় মৃতদের নাম-পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
বুধবার রাত থেকেই গুয়াহাটির রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন অন্তত দশ হাজার মানুষ। হাত কেটে রক্ত দিয়ে পোস্টার লিখে স্লোগান তোলেন ছাত্রছাত্রীরা। রাজধানী দিসপুরের সচিবালয়ের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ফেলেন প্রতিবাদীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বঙ্গাইগাঁও ও ডিব্রুগড়ে দু’কলাম সেনা মোতায়েন করা হয়। জোরহাটেও সেনা মোতায়েন করা হয়। ডিব্রুগড়ে জারি হয় ১৪৪ ধারা। সেখানে যে কোনও ধরনের জমায়েত, মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সিদ্ধান্ত হয়, অসমের অন্তত ১০টি জেলায় আরও ৪৮ ঘণ্টা ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা বন্ধ রাখা হবে। গুজব রুখতে বুধবার ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছিল প্রশাসন। এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অসমের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তারা। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, রাজ্য পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আর নেই গোটা পরিস্থিতি। তাই আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব দেওয়া হোক সেনাবাহিনীকেই।
বিভিন্ন এলাকায় জারি হয়েছে কার্ফু। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, রসদ ফুরিয়ে আসছে এবার। খেতে না পেয়ে মরতে হবে শীতে। অভিযোগ, এ সব কিছুর জন্য দায়ী এই নাগরিকত্ব বিল। বিক্ষোভ যেন বাঁধ মানছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, গুয়াহাটির এক আন্দোলনকারীর কথায়, "আমাদের বক্তব্য রাজনৈতিক নেতাদের কানে কখনও পৌঁছয়নি। তাই এটা এখন আমাদের আন্দোলন, সাধারণ মানুষের আন্দোলন। আমরা চিৎকার করে বলব, 'ক্যাব আমাক নালাগে... নালাগে! নালাগে!' আমাদের ক্যাব চাই না।"