কোথাও ৩ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি, আবার ঠিক পাশের বুথেই স্লোগান— ‘ভাতা নয়, চাকরি চাই’। এই দ্বিমুখী বার্তার গোলকধাঁধায় পড়ে আমজনতাও এখন ধন্দে— বিজেপি আসলে ঠিক কী চায়?

কী চায় বিজেপি? ভাতা না কাজ!
শেষ আপডেট: 22 February 2026 20:35
বাংলার রাজনীতির ময়দানে এখন ‘ভাণ্ডার’ যুদ্ধের দামামা। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) তুরুপের তাস ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (Lakshmir Bhandar), আর অন্যদিকে সেই জমি পুনরুদ্ধারে গেরুয়া শিবিরের (BJP) নবতম বাজি ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ (Annapurna Bhandar)। কিন্তু এই ভাণ্ডার-রাজনীতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্ববিরোধিতা ও ধন্দ এখন পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রকট। কোথাও ৩ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি, আবার ঠিক পাশের বুথেই স্লোগান— ‘ভাতা নয়, চাকরি চাই’। এই দ্বিমুখী বার্তার গোলকধাঁধায় পড়ে আমজনতাও এখন ধন্দে— বিজেপি আসলে ঠিক কী চায়?
ভাতারের দেওয়ালে ‘ভাতা’ বনাম ‘চাকরি’র দ্বন্দ্ব (Bhata or Job What BJP Wants)
পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের ১৯৩ নম্বর পার্টের দেওয়ালে বড় বড় করে লেখা হয়েছে, ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা। ১ জুন হইতে।’ স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এটা তাঁদের দলের ঘোষিত নীতি। ক্ষমতায় এলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভোলবদল করে হবে ‘অন্নপূর্ণা’, আর অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে করা হবে ৩ হাজার। অথচ ঠিক তার পাশের ১৯৪ নম্বর বুথের দেওয়ালে সেই বিজেপিই লিখছে, ‘ভাতা নয়, চাকুরী চাই। পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।’
দেওয়াল লিখনের এই বৈপরীত্য কি কেবল রণকৌশল, নাকি আদর্শগত বিভ্রান্তি? প্রশ্নটা উঠছেই। কারণ, একদল কর্মী যখন ভাতার অঙ্কে টেক্কা দেওয়ার কথা বলছেন, অন্য দল তখন ভাতার রাজনীতিকেই কটাক্ষ করছেন।

‘মলম’ না কি ‘চিরস্থায়ী সমাধান’?
বিজেপির এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দলের মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার যে যুক্তি সাজিয়েছেন, তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, ভাতা দেওয়া আর চাকরির দাবি করা— এই দু’টির মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। তাঁর বক্তব্য, “৭০ বছরের ক্ষয় হতে হতে এই রাজ্য এখন রাহুগ্রস্ত। এই আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে ভাতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে ভাতা দিতে গিয়ে সমাজকে ‘ভাতাজীবী’ করে তোলার যে চক্রান্ত চলছে, তা বন্ধ হওয়া দরকার।”
বিজেপির যুক্তি হল, বর্তমান সরকার দিনে মাত্র ৫০ টাকা (মাসে ১৫০০ টাকা) দিচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। তাই তাঁরা ১০০ টাকা (মাসে ৩০০০ টাকা) দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু সেই সঙ্গেই তাঁদের দাবি, ভাতাকে চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে ‘সাময়িক মলম’ হিসেবে দেখা উচিত। বিজেপির আসল লক্ষ্য নাকি মানুষকে আত্মনির্ভর করা, যাতে তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন।
‘কথা বনাম কাজ’-এর রসায়ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিজেপি আসলে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র নীতিতে এগোচ্ছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা বলেন তা করে দেখান— এই বিশ্বাস বাংলার মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছে। ফলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সরাসরি বিরোধিতা করার সাহস পদ্ম-শিবিরের নেই। তাই তাঁরা নাম বদলে আরও বেশি টাকার লোভ দেখাচ্ছেন।
তৃণমূলের পাল্টা দাবি, বিজেপি ভিন রাজ্যে ক্ষমতায় আসার জন্য বাংলার মডেলকে ‘টুকলি’ করে ভুল বুঝিয়ে ভোট পায়, আর জয়ের পর সব প্রতিশ্রুতি ডাস্টবিনে চলে যায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা প্রতিশ্রুতি দেন, তা পালনে তিনি অবিচল, এই সত্যটা এখন খোদ গেরুয়া শিবিরের নেতা-কর্মীরাও আড়ালে স্বীকার করছেন।
ভোটমুখী বাংলায় ভাতার অঙ্ক বাড়িয়ে কি বাংলার নারী হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারবে বিজেপি? না কি ‘ভাতা বনাম চাকরি’র এই দ্বিমুখী প্রচার তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে? ভাতার দেওয়ালে লেখা ৩ হাজার টাকার অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার কি ১ জুনের পর সত্যিই মানুষের ঘরে পৌঁছাবে, না কি তা কেবলই নির্বাচনী স্তোকবাক্য হয়ে থেকে যাবে— সেই উত্তর মিলবে ভোটের বাক্স খুললেই। তবে আপাতত, ‘ভাতাজীবী’ তকমা দিয়ে আবার ভাতারই অঙ্ক বাড়ানোর এই অদ্ভুত রাজনীতি বাংলার ভোটারদের কাছে এক বিরাট ধাঁধা হয়েই রইল।