যে তৃণমূলকে জীবনের প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে এতগুলো বছর লড়াই করলেন, সেই দলের ‘আপ্যায়নে’ সাড়া দিয়ে আজ তিনি যখন পুরনো দলের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছেন, তখন কি কোথাও বিনোদের সেই ‘গদ্দার না হওয়ার’ দম্ভটা ডাহা হেরে গেল না?

প্রতিকুর রহমান ও পঞ্চায়েত ওয়েব সিরিজের বিনোদ
শেষ আপডেট: 22 February 2026 12:59
জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘পঞ্চায়েত’-এর (Panchayat Season 4) সেই দৃশ্যটি মনে পড়ে? যখন প্রধানজি এবং তাঁর দলবল ফুলেরা গ্রামের অতি সাধারণ, কিছুটা বোকা অথচ নিজের ধরনে বুদ্ধিমান বিনোদকে (Vinod Panchayat) নেমন্তন্ন করে বাড়িতে ডেকে আনেন। পাতে পড়ে উপচে পড়া ব্যঞ্জন। উদ্দেশ্য অতি স্পষ্ট— বিনোদকে খাইয়ে-দাইয়ে খুশি করে নিজেদের দলে টানা এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতা জেনে নেওয়া। দু’বেলা ঠিকমতো খেতে না পাওয়া বিনোদ একরাশ উৎসাহ নিয়ে সেই আপ্যায়ন গ্রহণ করেছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো তাকে তার কারণেই মানুষগুলো আপন করে নিয়েছে। তাদের মান্যতা পেয়ে সে মনে মনে আপ্লুতও হয়েছিল।
কিন্তু মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। খাওয়ার মাঝপথেই বিনোদ বুঝতে পারে, এই বিপুল আয়োজন তাকে ভালবেসে নয়, বরং নেহাতই স্বার্থের প্রয়োজনে। তার অস্তিত্ব আসলে কোনওদিনই ম্যাটার করেনি, সে ছিল কেবল দাবার এক বোড়ে। সেই মুহূর্তে ঠকে যাওয়ার যে নিদারুণ কষ্ট বিনোদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল, তা বড় চেনা। সেই তীব্র যন্ত্রণার পিঠে দাঁড়িয়েই বিনোদ বলতে পেরেছিল, “আমি গরিব হতে পারি, কিন্তু গদ্দার নই!”
আশ্চর্যভাবে, শনিবার আমতলার রাস্তায় দাঁড়িয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) হাত থেকে পতাকা নেওয়া প্রতিকুর রহমানের (Pratikur Rahaman TMC) ছবিটা বিনোদের সেই ‘গদ্দার’ না হওয়ার সংকল্পকে যেন এক চরম উপহাসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। প্রতিকুরও কি একসময় আলিমুদ্দিনের ‘মান্যতা’ পেয়ে আপ্লুত হননি? যে লাল ঝান্ডাকে জীবনের ধ্রুবতারা মেনে ছাত্র-যুব আন্দোলনের কঠিন পথ পেরোলেন, আজ সেই বামনেতা (CPIM) যখন বলেন, “এটা কেবল ট্রেলার, ছবি এখনও বাকি”, তখন মনে হয় রাজনীতির ময়দানে ‘নৈতিকতা’ শব্দটা সত্যিই কতটা ঠুনকো।
বিনোদ বুঝতে পেরেছিল, তার দারিদ্রকে হাতিয়ার করে তাকে কেনা যাচ্ছে না। কিন্তু প্রতিকুর কি পারলেন? তিনি সিপিএমের (CPIM News) অন্দরে ‘লবিবাজি’ বা ব্রাত্য হওয়ার নালিশ তুলেছেন। হতে পারে তাঁর সেই অভিমান বা প্রশ্নগুলো ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু যে তৃণমূলকে জীবনের প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে এতগুলো বছর লড়াই করলেন, সেই দলের ‘আপ্যায়নে’ সাড়া দিয়ে আজ তিনি যখন পুরনো দলের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছেন, তখন কি কোথাও বিনোদের সেই ‘গদ্দার না হওয়ার’ দম্ভটা ডাহা হেরে গেল না?
প্রতিকুর এখন তৃণমূলের (TMC News) সম্পদ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর পিঠ চাপড়ে বলছেন, সিপিএমকে রাস্তায় নামাতে এই প্রতিকুরই নাকি পথ দেখাবেন। এই দৃশ্য দেখে যে কোনও সাধারণ মানুষের মনে হতেই পারে— বিনোদ চরিত্রটিই আসলে শ্রেষ্ঠ। সে হয়তো হাই-প্রোফাইল নেতা নয়, তার কোনও ‘পিকচার বাকি’ নেই। কিন্তু স্বার্থ আর আদর্শের দ্বন্দ্বে সে নিজের পিঠের শিরদাঁড়াটা সোজা রাখতে পেরেছিল।
দিনের শেষে এই ‘দলবদলু’ রাজনীতির ডামাডোলে প্রতিকুররা ক্ষমতার স্বাদ পেলেও, হেরে যাচ্ছে বিনোদের মতো সেই সব সাধারণ কর্মীদের লড়াই, যাঁরা শত অভাবেও আদর্শের সঙ্গে বেইমানি করেন না। নামের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া চরিত্র বিনোদ আজও অগণিত মানুষের কাছে প্রিয় থেকে যায় তার হার না মানা ওই এক লাইনের জেদের কারণেই। প্রতিকুররা হয়তো বড় জয় পেলেন, কিন্তু বিনোদের সেই দুর্মর নৈতিকতার কাছে তাঁরা আজ ব্রাত্যই থেকে গেলেন।