দ্য ওয়াল ব্যুরো: অগ্ন্যাশয় ক্যানসার নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেক গবেষণা হয়েছে। অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস যেখান থেকে বিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় উৎসেচক বের হয়, সেই কোষেরই অনিয়মিত বৃদ্ধি হয়ে যদি ক্যানসার তৈরি হয় তাহলেই সর্বনাশ। কারণ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার সারানো যেমন জটিল ব্যাপার তেমনি রোগীও পাঁচ বছরের বেশি বাঁচে না। এই জটিল ক্যানসারের প্রতিষেধক খুঁজতেই দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করছিলেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী। নাম ডক্টর অনিন্দ্য বাগচি। আমেরিকায় গবেষণারত বাঙালি বিজ্ঞানী এই অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের এক প্রধান কারণ খুঁজে পেয়েছেন। শুধু তাই নয় ক্যানসারকে জব্দ করার উপায়ও বের করেছেন।
অগ্ন্যাশয়ের ঠিক কোন কোষে টিউমার তৈরি হয়, কোন কোন প্রোটিনের বাড়াবাড়িতে কোষের অনিয়মিত বৃদ্ধি হতে শুরু করে
(Metastatic Growth), তার সঠিক তথ্য এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে আসেনি। গবেষক অনিন্দ্য বলছেন, তিনি অগ্ন্যাশয়ের কোষে এমন এক প্রোটিনের খোঁজ পেয়েছেন যা ক্যানসারের জন্য দায়ী। এই প্রোটিনই কোষের বিভাজন ঘটিয়ে ‘ম্যালিগন্যান্ট টিউমার’ তৈরি করে যা থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে গোটা অগ্ন্যাশয়তেই। কাজেই এই প্রোটিনকে রোখা গেলেই ক্যানসার কোষের বাড়বাড়ন্ত বন্ধ হয়ে যাবে। ডক্টর অনিন্দ্যর গবেষণার মূল ভিত এটাই।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োকেমিস্ট্রিতে স্নাতক ডক্টর অনিন্দ্য জেনেটিক্স নিয়ে পিএইচডি করেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পোস্ট-ডক্টরাল রিসার্চে তাঁর বিষয় ছিল ক্যানসার জেনেটিক্স। নিউ ইয়র্কের কোল্ড স্প্রিং হারবর ল্যাবরেটরিতে থেকে পোস্ট-ডক্টরেট করে মিনেসোটা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করেন ২০০৮ সাল থেকে। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব মাউস জেনেটিক্স ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর, স্যানফোর্ড বার্নহাম প্রেবিস মেডিক্যাল ডিসকোভারি ইনস্টিটিউটে অগ্ন্যাশয় ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করছেন।
এবার দেখে নেওয়া যাক অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার কেন হয় আর বাঙালি বিজ্ঞানী ঠিক কোন পথ ধরে এগিয়েছেন।

অনিয়মিত বৃদ্ধি অগ্ন্যাশয়ের কোষে
অগ্ন্যাশয়ের কোষে ক্যানসার দু’ভাবে ছড়াতে পারে। সাধারণত দেখা যায় অগ্ন্যাশয়ের যে কোষ থেকে বিপাকের জন্য উৎসেচক বা এনজ়াইম বের হচ্ছে সেখানেই আচমকা কোষ বিভাজন শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ কোষ যদি হঠাৎ করেই বিভাজিত হয়ে আকারে বড় হতে শুরু করে তাহলে তার প্রভাব পড়ে অন্যান্য কোষেও। বিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম আর বের হতে পারে না। সেই কোষে এমন টিউমার তৈরি হয় যা ক্যানসারের জন্য দায়ী। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডেনোকারসিনোমা’
(pancreatic ductal adenocarcinoma ) । এই ধরনের ক্যানসার হলে খিদে কমতে থাকে, পেটে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়, প্রস্রাবের রঙ ঘন হয়, ব্লাড ক্লটের লক্ষণ দেখা যায়, ত্বকে হলদেটে ছাপ পড়ে, জন্ডিসের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
বিজ্ঞানী বলছেন, ১০ শতাংশ রোগী অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার নিয়ে পাঁচ বছরের বেশি বেঁচে থাকতে পারে। সার্ভিভাল রেট ৪০%। প্যানক্রিয়াসের ক্যানসারকে কাবু করার জন্য দু’ভাবে এগিয়েছিলেন ডক্টর অনিন্দ্য বাগচি ও তাঁর টিম।
হাইপোক্সিয়ার জিন অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে দায়ী নয়, প্রথমবারের গবেষণা বাতিল
‘গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি’ জার্নালে যে গবেষণার রিপোর্ট বেরিয়েছে সেখানে ডক্টর অনিন্দ্য বলেছেন, প্রথমে তাঁরা মনে করেছিলেন হাইপোক্সিয়া বা শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী যে জিন তার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে প্যানক্রিয়াসের ক্যানসারের। শুধু

তাঁরা নন, এই ধারণা এতদিন অনেক বিজ্ঞানীরই ছিল। তার মানে হল, হাইপোক্সিয়ার কারণে যে জিনের বাড়াবাড়ি হয় সেই
HIF1A জিনকে বশে আনতে পারলেই ক্যানসার রোখা যাবে। সেটা কীভাবে হবে জানতে ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানী। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার দেখা যায়।
যে ইঁদুরগুলির অগ্ন্যাশয়ে মেটাস্টেসিস ঘটিয়েছিলেন বিজ্ঞানী অর্থাৎ সহজ করে বলতে গেলে যে ইঁদুরগুলো অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিল, তাদের কারও শরীরেই ওই নির্দিষ্ট জিনের বাড়াবাড়ি দেখা যায়নি। বরং ক্যানসারের কারণে শরীরের অন্যান্য কোষ আক্রান্ত হয়ে খুব দ্রুত মৃত্যু হয়েছিল কয়েকটি ইঁদুরের। এর থেকেই বিজ্ঞানী বুঝতে পারেন, এতদিন যা মনে করা হত সেই ধারণা ভুল। হাইপোক্সিয়ার জিনের সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের যোগসূত্র নেই।
অগ্ন্যাশয়ে তাণ্ডব করে এক প্রোটিন, তারই বাড়াবাড়িতে ফুলেফেঁপে ওঠে টিউমার কোষ
HIF1A জিন তো বাতিল হল। এবার ডক্টর অনিন্দ্য দেখলেন, ইঁদুরগুলির কোষে এমন এক প্রোটিন তৈরি হচ্ছে যার কারণেই ক্যানসার

কোষের আরও বাড়বৃদ্ধি হচ্ছে। এই প্রোটিনকে চিহ্নিত করলেন বিজ্ঞানী ও তাঁর টিম। এর নাম
PPP1R1B। বিজ্ঞানী এবার অগ্ন্যাশয়ের কোষ থেকে এই প্রোটিনকে সরিয়ে দিলেন। সেটা করা হল জটিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। সহজ করে বলতে গেলে, প্রোটিনকে কোড করে যে জিন, তাকেই কোষ থেকে ঘাড় ধরে বার করে দিলেন বিজ্ঞানী। এর পরেই দেখা গেল, ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমছে। ডক্টর অনিন্দ্য বলেছেন, এই প্রোটিনই অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ। একে আটকাতে পারলেই কোষের বৃদ্ধি বন্ধ হবে, আশপাশের কোষে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। এবার এই প্রোটিনকে আটকাতে পারবে এমন উপাদানের খোঁজ পেলেই তার থেকে ওষুধ তৈরি করা যাবে। বাঙালি বিজ্ঞানী বলেছেন, এই প্রোটিনের মোকাবিলা করতে পারবে এমন উপাদান নিয়ে তাঁরা গবেষণা করছেন। খুব তাড়াতাড়ি সেই উপাদানগুলিকে চিহ্নিত করে ফেলা হবে। এর থেকে ওষুধ তৈরি হলে অগ্ন্যাশয় ক্যানসার সারানো যাবে, মৃত্যুও কমবে।