অর্পণ নেই, কিন্তু যাঁরা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাঁদের সকলের কাছে 'অর্পণদা' আজও ভীষণ জীবন্ত। এই স্বীকৃতি যত না অর্পণের নিজের, তাঁর থেকেও অনেক বেশি তাঁর এই অসমবয়সী সহকর্মীদের।

ছবি- অর্পণ পাড়ুইয়ের পিএইচডি জুনিয়র সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়, গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 8 August 2025 18:49
Camptopoeum paruii… বিশ্বের এক নতুন ধরনের মৌমাছির স্পিসিস যা কিনা প্রথম পাওয়া গেল আমাদের এই ‘পোড়া দেশ’ ভারতেই। ওড়িশার কুলডিহা-তেই এর বাস। বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল ‘জার্নাল অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’র এই রিসার্চ পেপারের বয়স এখনও একদিনও হয়নি। তাতেই নাম উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের দুই বাঙালি গবেষকের, অদিতি দত্ত এবং সুপ্রতিম লাহা।
কিন্তু যাঁকে ছাড়া এই আয়োজনই বৃথা, তিনি আজ সকলের মাঝে না থাকলেও তাঁকে মনে রেখে দিয়েছেন তাঁর কমরেডরা। যে নামটি ছাড়া এই পেপারই অসম্পূর্ণ, বলা ভাল, যাঁর নামে নামকরণ হল এই স্পিসিসের - তিনি অর্পণ পাড়ুই। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের সকলের প্রিয় ‘অর্পণদা’।
২০১৭ সাল নাগাদ মারা গিয়েছেন অর্পণ। অনেকদিনই তো হল তিনি নেই, কিন্তু সকলের প্রিয় কমরেডকে যে কেউই ভোলেননি - তার প্রমাণ অর্পণের কিছু জুনিয়র, সহকর্মীরা। খবরটা আসার পর ‘দ্য ওয়াল’-এর তরফে যোগাযোগ করা হয় পেপারের সহ-লেখক অদিতি দত্তের সঙ্গে। কথা বলেন সহ-লেখক সুপ্রতিম লাহা-ও। এই দু’জনই অর্পণ পাড়ুইয়ের প্রায় সমসাময়িক এবং একই ল্যাবের স্কলার।
পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার মৌমাছির স্পিসিস আছে। তাঁদের মধ্যে কিন্তু হাতে গোনা কিছু স্পিসিসই চাক বানিয়ে মধু সংগ্রহ করতে পারে। বেশিরভাগের কথা আমরা জানিই না। কিন্তু যে মৌমাছি নিয়ে এই পেপার পাবলিশ হয়েছে, তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এই যে - তারা মাটিতে গর্ত করে বাসা বাঁধে।
২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত অদিতি ছিলেন ‘অর্পণদা’র সঙ্গে। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের ইকোলজি রিসার্চ ইউনিট, ডিপার্টমেন্ট অফ জুলজির প্রফেসর পার্থিব বসুর অধীনে কাজ করেছেন। গতবছর নভেম্বরে আরও এক ‘গাইড’ পার্থিব স্যারকেও হারিয়েছেন।
২০০৮ কিংবা ২০০৯ সাল নাগাদ, পিএইচডি শুরু করেন অর্পণ।
সুপ্রতিম জানান, অর্পণদার কাছ থেকে ছোট ছোট জিনিস প্রায় হাতে ধরে শিখেছেন তিনি। আজও তাঁর শেখানো জিনিস পাথেয় সুপ্রতিমের। ‘ওড়িশার কুলডিহা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঙ্কচুয়ারির ফরেস্টের একদম ভেতরে থেকে মাটির কাছাকাছি মিশে কাজ করতেন তিনি। পিঁপড়ে নিয়ে থিসিস করলেও পশু-প্রাণী নিয়ে অফুরন্ত উৎসাহ। আদ্যোপান্ত একজন প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ ছিলেন অর্পণ।’

ছবি সৌজন্যে - অর্পণ পাড়ুইয়ের পিএইচডি জুনিয়র সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়
অদিতির কথায়, ‘আজকের এই নামকরণের ইতিহাসের শুরুটা অনেক বছর আগের কথা। এখন অনেকে মৌমাছি নিয়ে কাজ করলেও ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ কেউই প্রায় এই দিকটা নিয়ে কাজ করছিলেন না। হাতে গোনা কিছুজন এই কাজে যুক্ত থাকলেও সেখান থেকে সাহায্য পাওয়াটা কয়েকজন পিএইচডি স্টুডেন্টের জন্য প্রায় দুঃসাধ্য এক ব্যাপার ছিল। তাছাড়া ওই সময় মৌমাছির ট্যাক্সোনমি নিয়ে খুব যে কাজ কিছু হয়েছে, এমনটাও নয়।’
মৌমাছির ট্যাক্সোনমি নিয়েই একসঙ্গে কাজ করতেন অদিতি, অর্পণ, সুপ্রতিম। পিএইচডির জন্য একদিন স্যাম্পেল কালেকশন করতে গিয়ে তাঁরা খেয়াল করেন চেনাজানা কোনও মৌমাছির সঙ্গে এই মৌমাছির মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
পার্থিব স্যারের সহায়তায় বিদেশের নাম করা ট্যাক্সোনমিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানানো হয় এই ‘ডিসকভারি’র কথা। পাঠানো হয় মৌমাছির ছবি, সঙ্গে নমুনা। কিন্তু অপেক্ষার তখনও অনেক বাকি।
অদিতির জানান ওই সময় ব্রিটেন, বেলজিয়ামের বিজ্ঞানীরা মিলে আলোচনায় বসেন। খুব খুঁটিয়ে দেখে ২০১৫ নাগাদ তাঁরাও নিশ্চিত করেন, জেনাস মিললেও স্পিসিস মিলছে না। অর্থাৎ, খুব সম্ভবত এটাই নতুন এক খোঁজের সূচনা হতে চলেছে। তারপর সেই নিয়ে একটা পেপার পাবলিশও হয়।
কিন্তু আজকের এই স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেননি অর্পণ বা পার্থিব স্যার, কেউই। ২০১৭ সালে অর্পণ মারা যান, গত বছর নভেম্বরে স্যারও চলে গিয়েছেন।
অদিতি বলেন, ‘২০১৮ সালে স্পিসিসের নামকরণের সময় আসে। বিশ্বের অন্যান্য নানা জায়গায় এর জেনাস পাওয়া গেলেও স্পিসিস তো এতদিন ছিল না। ভারতের দিকে তো ছিলই না এর আগে কখনও। শুধু তাই নয়, বিশ্বের আর কোথাও এই মৌমাছি আগে পাওয়াই যায়নি। তখন ঠিক হয়, অর্পণদার নামেই নাম রাখা হবে এই মৌমাছির স্পিসিসের। Camptopoeum paruii...।'
নতুন কিছু পেলেই সেটার আইডেন্টিফিকেশন না করা পর্যন্ত ছাড়তেন না অর্পণ। ভীষণ ভালবাসার জায়গা ছিল ল্যাব, পড়াশোনা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলেন। গানবাজনা হোক বা যেকোনও অ্যাক্টিভিটি, অর্পণ নামটা কমন। ছবি তোলার হাতও ছিল দুর্দান্ত।

ছবি সৌজন্যে - অর্পণ পাড়ুইয়ের পিএইচডি জুনিয়র সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়
কথা বলতে বলতে, সুপ্রতিম মনে করতে থাকেন অর্পণের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা। বলেন, ‘কোনও কিছু নিয়ে পড়া শুরু করলে কোনওদিকেই হুঁশ থাকত না ওঁর। পিঁপড়ে নিয়ে অর্পণদার ভালবাসা এক অন্য জগতের যেন। এত নলেজ, যে চাইলেই একটা বই লিখে ফেলতে পারতেন, সেটা যদিও হয়ে ওঠেনি। কী করে মানুষটা এত কিছু মনে রাখতে পারে!’
পিএইচডির পরেও পোস্ট ডক্টরেটের ভাবনাচিন্তা ছিল অর্পণের। সেই উদ্দেশ্যে ২০১৭ সাল নাগাদ প্রায় ৬-৭ মাস মৌমাছি নিয়ে গবেষণার কাজও করছিলেন ট্যাক্সোনমি ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত কলকাতার জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে।
বাউরিয়ায় আদি বাড়ি অর্পণের। ওখানে তাঁর বাবার একটা স্কুল আছে। আশুতোষ থেকে গ্র্যাজুয়েশন, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে মাস্টার্স এবং তারপর সেখানেরই জুলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে পিএইচডির যাত্রা শুরু।
কথা বলতে বলতে গলা খানিক ভারাক্রান্ত শোনায় অদিতির। কেমন ছিল অর্পণ পাড়ুইয়ের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা?
প্রশ্ন শুনে খানিক খেইও হারিয়ে ফেলেন অদিতি। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, ‘কাজঅন্ত প্রাণ ছিলেন অর্পণদা। পোকাপাগল তো বটেই। প্রচুর পোকা নিয়ে হয়তো বসেছি আইডি (আইডেন্টিফিকেশন) করতে, যতক্ষণ না কোনও নতুন পোকা খুঁজে পাচ্ছি, সেটা নিয়ে একটা আলাদাই উত্তেজনা আমরা অর্পণদার মধ্যে দেখতে পেতাম। সবসময় একধরনের পজিটিভ চিন্তাভাবনা কাজ করত। অর্পণদা বলত, ‘ঠিক কিছু না কিছু আমরা বার করে ফেলব অদিতি, বার করবই।’ আমরা যে এতদূর এগোতে পেরেছি সেটা শুধুমাত্র ওঁর জন্যই।’
মাঝে অনেকদিন পেরিয়ে গিয়েছে অর্পণ পাড়ুই নেই, কিন্তু যাঁরা কিছুদিনের জন্যও তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাঁদের সকলের কাছে অর্পণদা আজও ভীষণ জীবন্ত। এই স্বীকৃতি যত না অর্পণের নিজের। তাঁর থেকেও অনেক বেশি মনের কাছের তাঁর এই অসমবয়সী সহকর্মীদের।