
আউশগ্রামের ঘন জঙ্গলে বইমেলা
শেষ আপডেট: 27 February 2025 19:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: কলকাতা থেকে পূর্ব বর্ধমানের (Bardhaman) আউশগ্রামের (Aaushgram) উত্তর রামনগর গ্রামের বারাসতী ডাঙার দূরত্ব হবে ১২০ কিলোমিটারের আশপাশে। এই রাস্তায় বইমেলা (Book Fair) পৌঁছতে সময় লাগল প্রায় চারযুগ। ১৯৭৬ সালে কলকাতা বইমেলা শুরু হয়। আর ১৯৮৪সালে লাভ করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাসাবতীডাঙায় বইমেলা শুরু হল ২০২৫ সালে।
এখানে মেলা তো হামেশায় হয়। চড়ক মেলা থেকে ধর্মরাজের মেলা কিংবা মাজারের মেলা। তা বলে অজয়নদের ধারে ঘন জঙ্গলের মাঝে বইমেলা! পাণ্ডববর্জিত এলাকায় বইমেলা ভাবাও খুব সহজ কাজ নয়। কিন্তু সেই অসাধ্য সাধন কাজ করে দেখিয়েছেন রাধামাধব মণ্ডল ও সেখ আব্দুল লালনের মতো কয়েকজন যুবক।
যেখানে সকাল হলেই যে যার মতো করে রুজি রোজগারে বেড়িয়ে পড়েন। কেউ জঙ্গলে পাতা কুড়াতে যান, কেউ জমিতে শ্রমিকের কাজ করতে। সেখানেই চলছে বইমেলা। মালিয়ারি, মল্লিকপুর,গোপালপুরের আদিবাসী মহল্লার মাঝে বারাসতী ডাঙায় ভাষা দিবসের আগে ২০ ফেব্রুয়ারি আউশগ্রাম বইমেলা শুরু হয়। রুক্ষ্ম- সুক্ষ্ম লাল মোরামের শক্ত মাটিতে, মর্মর ধ্বনির মাঝে চলছে বইমেলা।
বছর বছর এখানে দুর্গাপুজোর ভাসানের দিনে কার্নিভালের আসর বসে। শহুরে আলোকছটা, বা চাকচিক্য না থাকলেও এলাকার ১৭ টি গ্রামের প্রায় ৫০ টি দুর্গা প্রতিমা নিয়ে কার্নিভাল হয়। অনেককাল আগে কাহাররা বাঁশে বেঁধে প্রতিমা নিয়ে আসতো। তারপর গরুর গাড়িতে। আর এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিমা আসে ট্রাক্টর বা মোটর ভ্যানে।এই বারাসতী ডাঙায় নাকি আগে সতীদাহ হত।বর্তমানে তার নির্দশনও আছে একটি শ্মশান। সেই কুসংস্কারকে অতিক্রম করে বই মেলা করতে আয়োজকদের কম কাঠগড় পোড়াতে হয়নি। ঐতিহাসিক পাণ্ডু রাজাদের ঢিবির পাশে বইমেলায় আয়োজন। এক সময়ে এখানে দুর্বৃত্তদের ঘাঁটি ছিল। বাম আমলে জঙ্গল মহলের আউশগ্রামকে বলা হতো লালদুর্গ। সেই দুর্গে এখন অবশ্য ঘাসফুলের প্রাধান্য।
আয়োজকরা আশাবাদী তাদের এই ক্ষুদ্র চারাগাছটি একদিন মহীরুহে পরিণত হবে। একেবারে নতুন মেলায় বইয়ের স্টলের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। ৪২ টি বুক স্টল নিয়ে পথ চলা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন মেলায় ভিড় হচ্ছে। স্কুল পড়ুয়ারা তো খুবই খুশি। তারা হাজারো বইয়ের মাঝে তাদের পছন্দের বই খুঁজছে।
বারাসতী ডাঙার ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনও ব্যাঙ্ক নেই। নেই কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র। দমকল তো অনেক দূরের কথা। আছে শুধু বন আর ঘন বন। আছে ময়ূরের দল। আছে হায়না,শিয়াল। আছে ময়াল সাপ। আয়োজক রাধামাধব মণ্ডল আক্ষেপ করে বলেন, "প্রশাসনের সব রকম সাহায্য আমরা পেয়েছি। কিন্তু বনের মাঝে বইমেলা, সেই বন দফতরের কোনও সাহায্য পাইনি।"
পাশেই পাণ্ডু রাজার ঢিপি। বেশ কয়েকবার কেন্দ্রীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কাছে আবেদন করলেও তারাও এগিয়ে আসেনি বলেও জানালেন তিনি। সমাজসেবী সেখ আব্দুল লালন জানান, "রুক্ষ মাটিতে বইয়ের চাষ হচ্ছে। জঙ্গলের সবাই এগিয়ে এসেছেন বই মেলায়। তাতেই এই কাজ সম্ভব হল।"
প্রথম মেলায় অংশগ্রহণকারী কয়েকজন বুক স্টলের মালিক জানান, ব্যাপক হারে বই বিক্রি না হলেও বই বিক্রি হচ্ছে। তারাও আশাবাদী আগামীদিনে এই বইমেলার আয়োজন বাড়বে। বই বিক্রি হবে।