
শেষ আপডেট: 6 February 2024 23:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তেঁতুল-বটের কোলে/ দক্ষিণে যাও চলে…
এই দক্ষিণটাই বড় গোলমেলে সুন্দরবনে। হলদে-কালো ডোরাকাটা দক্ষিণরায় যেখানে রাজার মতো চলাফেরা করে, সেখানে সাধারণ মানুষ তো কোন ছাড়, বন্দুকধারী শিকারিও সেঁধোতে ভয় পায়। আর কথায় বলে, সুন্দরবন মানুষখেকোদের ডেরা। সব রয়্যাল বেঙ্গলই কমবেশি নরখাদকের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেখানে প্রাণ হাতে করে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন খুঁজতে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। সুন্দরবনের একদম কোর এলাকায় ঢুকে মাটি খুঁড়ে বের করেছেন গুপ্ত-ধন।
রাজ্যের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জেনারেল অ্যান্ড অফিসিয়াল ট্রাস্ট্রি বিপ্লব রায় খোঁজ পেয়েছিলেন সুন্দরবনে বাঘের ডেরা আসলে প্রত্নতত্ত্বের খনি। সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করলেই মিলতে পারে অমূল্য সব রতন। শুধু বাঘের ভয়টাই যা বাধা। তিনি দলবল নিয়ে, বন্দুকধারী অভিজ্ঞ শিকারি ও মৎস্যজীবীদের নিয়ে প্রাণ হাতে করেই বাঘের বসতিতে ঢুকে পড়েন। বিপ্লববাবুর কথায়, আজ যেখানে বন কাঁপিয়ে বাঘেরা চলাফেরা করে, সেখানে একসময় গণ্ডার, হাতিও থাকত। মাটি খুঁড়ে যে সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে, তা থেকে পরিষ্কার একসময় অন্য বড় জন্তুদেরও আবাসস্থল ছিল সেটি। আর ছিল কুষাণ, গুপ্ত যুগের মানুষদের বসবাস। মাটির সাত ফুট নীচে থেকে কুষাণ যুগের মূর্তি, গুপ্ত যুগের ব্যবহৃত মাটির জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। গণ্ডারের দাঁতের ফসিল, হাতির বুকের হাড়, এমনকী মানুষের হাড়গোড়ও পাওয়া গেছে। অমূল্য রত্নভাণ্ডারের চেয়ে এই খোঁজ কোনও অংশেই কম নয়।
চমকের শেষ এখানেই নয়। প্রকৃতির বজ্রনির্ঘোষে সেইসব প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন মাটির নীচে চাপা পড়ে গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলছেন, খোঁড়াখুঁড়ি আরও গভীরে চালিয়ে যা দেখা গেছে তার থেকে স্পষ্ট, সেখানে রাস্তাঘাট, পাতকুয়ো, মন্দির সবই ছিল। মাটির ইট দিয়ে তৈরি পাকা দোতলা বাড়ির ভাঙা অংশও পাওয়া গেছে। তখন চুন-সুড়কির প্রচলন শুরু হয়নি। ইট গেঁথে গেঁথেই পাকা বাড়ি তৈরি হত। বাড়ির ভাঙা অংশে মাটির কলসি, বাসনপত্র সবই পাওয়া গেছে।
ঝড়খালি থেকে লঞ্চে যাত্রা শুরু হয়। হেরোভাঙা, বিদ্যাধরী নদী, মাতলা পেরিয়ে নেতাধোপানি হয়ে আরও গভীরে ঢোকেন প্রত্নতাত্ত্বিক, গবেষক ও অধ্যাপকদের টিম। রাস্তা দেখানোর জন্য স্থানীয় কয়েকজন মৎস্যজীবীও ছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলছেন, যত বেশি ভেতরে ঢোকা যাবে ততই বিপদ বাড়বে। কারণ গোটা এলাকাটা টাইগার রিজার্ভের অধীন। সুন্দরবনের একেবারে কোর এলাকা। এখানেই বাঘেরা নিশ্চিন্তে ও সদর্পে চলাফেরা করে। তাদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হওয়াটা খুব একটা ভাল কথা নয়। তবুও গুপ্ত-ধনের খোঁজে ভেতরে ঢুকতেই হয়। আর সেখানেই হাজার হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার খোঁজ মেলে।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলছেন, ৭-৮ ফুট মাটির নীচে কাঠ দিয়ে বাঁধানো ইটপাতা রাস্তা পাওয়া গেছে। তখনকার লোকেরা মিষ্টি জলের জন্য গভীর কুয়ো খনন করত। সেই কুয়োর সন্ধানও পাওয়া গেছে। বাড়ি-মন্দিরের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে। আর পাওয়া গেছে প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য কিছু মূর্তি। কার্বন ডেটিং করে সবকিছুরই বয়স বের করা হবে। তবে অনুমান করা হচ্ছে দেড় হাজার বছর আগেই সেই নগরী ছিল। রিপোর্ট পাওয়া গেলে এর রহস্য উন্মোচন হবে।