
শেষ আপডেট: 26 August 2018 18:30
ফাদার ভিকার[/caption]
এই গির্জার ফাদার ম্যাথেউ এম টমাস ওরফে ভিকার (এই নামে অধিক পরিচিতি ফাদারের) ‘দ্য ওয়াল’কে জানিয়েছেন চেঙ্গানুর, কুট্টানাড়-সহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গ্রামের ২৫-৫০টি পরিবারকে বেছে নিয়ে তাঁদের যাবতীয় দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে গির্জার তরফ থেকে। ফাদার নিজে এবং আরও কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যক্তির সাহায্যে একটি ট্রাস্ট গড়ে তুলেছেন। ফাদার ভিকারের সঙ্গে সেখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্গতদের সেবায় এগিয়ে এসেছেন ফাদারের সহকারী টমাস জর্জ, ট্রাস্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট জন টমাস, সম্পাদক জর্জ ম্যাথিউ, জোসেফ ফিলিপ এবং ভার্কি ভার্গিস।
ফাদারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এভারেস্ট বিজয়ী এবং প্রথম ভারতীয় বাঙালি হিসেবে সেভেন সামিট জয়ী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত। তিনি দ্য ওয়ালকে জানালেন " বিপদের দিনে জাতি ধর্ম বর্ণের উর্ধ্বে উঠে, সাধারণ মানুষ হিসেবে কেরালার বন্যাবিদ্ধস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা আমার কর্তব্য হিসেবে মনে করেছি। তাই এগিয়ে এসেছি"।
চেঙ্গানুরের বেশিরভাগ এলাকাই কৃষিনির্ভর। বন্যায় নষ্ট হয়ে গিয়েছে সব চাষের জমি। মাথায় হাত পড়ে গিয়েছে এলাকার অধিকাংশ মানুষেরই। ফাদার জানিয়েছেন, চেঙ্গানুরে বন্যায় এই মুহূর্তে বাস্তুহারা প্রায় ২০০ জন মানুষ। সাড়ে তিনশোর বেশি মানুষ বিপর্যস্ত। তাদের পাশে দাঁড়ানোটাও দরকার বলে জানিয়েছেন ফাদার ভিকার।
ফাদার আরও জানিয়েছেন, প্রতিটি পরিবারকে মাথা পিছু ৫০,০০০ থেকে এক লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। তার জন্য ইতিমধ্যেই চেষ্টা শুরু করে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে ২৫ লক্ষ টাকা জোগাড় করাই এই ট্রাস্টের লক্ষ্য। চেঙ্গানুর ছাড়াও নানা রাজ্যের এনজিও-দের এই কাজে এগিয়ে আসার জন্য আবেদন জানিয়েছেন ফাদার ভিকার। শুধু রাজ্যের মানুষই নন, বাংলা, বিহার থেকে কেরলে গিয়ে বন্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে বা জলবন্দি হয়ে আটকে পড়েছেন বহু মানুষ। কর্মহীন হয়েছেন। তাঁদের পরিবারের কাছেও অর্থ সাহায্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। শুধুমাত্র ঘরবাড়ি পুনর্গঠন নয়, তাদের রুজি রোজগারের ব্যবস্থাও করবে এই ট্রাস্ট।

কেরলে এই মুহূর্তে গৃহহীন প্রায় আট লক্ষ মানুষ। ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’-এ মানুষকে বাঁচাতে চলছে মরণপণ লড়াই। বৃষ্টি কমে গিয়েছে, ধীরে ধীরে নামছে জলস্তরও। কিন্তু, জল যত নামছে আরও স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে ধ্বংসস্তূপ। জমা জলে ভেসে বেড়াচ্ছে পচা গলা পশুর শব। ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত বাড়িঘরের যে টুকু মাথা উঁচিয়ে রয়েছে তার ভিতরও নোংরা জলে ভর্তি। চারপাশে কাদা আর জঞ্জাল। ত্রাণশিবির থেকে নিজেদের বাড়ির অবশিষ্টাংশ চিনে যাঁরা ফিরছেন তারাও পরিস্থিতি দেখে অকুল পাথারে। ঘরের ভিতর কোথাও ঘাপটি মেরে রয়েছে বিষধর সাপ। কোথাও বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে কুমির। জলবন্দি রাস্তায় আশ্রয়ের খোঁজে সাঁতরে বেড়াচ্ছে বিশাল পাইথন। পরিত্যক্ত বাড়ি হয়ে উঠেছে বিষাক্ত পোকামাকড় আর সাপখোপের আস্তানা। পানীয় জলের হাহাকার আর মহামারির বিপদ মাথায় নিয়ে চলছে নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি।
এখনও অবধি ৮০টি বাঁধ খুলে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের অভাব। পেট্রোল পাম্পে মিলছে না তেল। আলাপুঝা, এর্নাকুলাম, ত্রিশূর, পথমনথিট্টায় এখন পরিস্থিতি সব চেয়ে ভয়াবহ। এই সব জায়গায় রাস্তাঘাট পুরোপুরি জলের তলায়। ত্রিশূরের প্রায় গোটাটা ডুবে গিয়েছে। কোথাও কোথাও ত্রাণ শিবিরেও ঢুকে পড়ছে জল। ফাদার ভিকার জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে নানা অসুখ। মৃত পশুদের পচা গলা দেহ থেকেও ছড়াচ্ছে রোগ। তাই রোগের প্রার্দুভাব কমাতে বিপর্যস্ত মানুষদের কাছে নানা রকম ওষুধ পৌঁছনোর ব্যবস্থাও করা হবে। প্রতিটি মানুষের প্রার্থনা, ছোট ছোট সাহায্যই এই সর্বহারা মানুষগুলোকে তাদের আশ্রয় জোগাবে। যা হারিয়ে গিয়েছে সেটা তো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, তবে যাঁরা অন্ধকার হাতড়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছেন তাঁদের সামনে চলার পথ তৈরি করে দেওয়াটাই এই ট্রাস্টের মূল উদ্দেশ্য বলেই জানিয়েছেন ফাদার ভিকার।
কেরলের মানুষের যন্ত্রণা কতটা সেটা বোঝার সাধ্য আমার, আপনার কারোর নেই। প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি না করলে এই বিপর্যয়ের গভীরতাকে আঁচ করাও সম্ভব নয়। নিজের প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন যাঁরা কোনও ত্রাণই তাঁদের সেই যন্ত্রণার জায়গা ভরাট করতে পারবে না, তবে সহৃদয় মানুষের প্রার্থনা ও সাহায্য হয়তো সেই ক্ষতে সামান্য প্রলেপ দিলেও দিতে পারে। সেটাও বা কম কথা কি! কে কতটা সাহায্য করল সেটা বড় কথা নয়। সবচেয়ে আগে দরকার সঙ্কট মুক্তি। সেটা যে ভাবেই হোক, যেমন ভাবেই হোক। আপনার কী মত?