
শেষ আপডেট: 17 October 2018 11:11
অর্ঘ্য দত্ত
সাগরপারের এই মায়ানগরীর অভিভাবিকা মুম্বাদেবী। তাঁর নাম থেকেই মুম্বাই।
মুম্বাদেবীর সঙ্গে দেবী দুর্গার বেশ কিছু মিল আছে। বলা হয়, 'মুম্বারকা' নামের এক দানবের অত্যাচার থেকে এখানকার আদি বাসিন্দাদের রক্ষা করতেই মুম্বাদেবীকে মর্ত্যে পাঠিয়েছিলেন ব্রহ্মা।
শুনলেই মহিষাসুরমর্দিনীর কথা মনে পড়ে যায়, তাই না? শুধু তা-ই নয়, মুম্বাদেবীর হাতের সংখ্যাও অন্য দেবদেবীদের মতো দুই বা চার নয়। তিনি অষ্টভুজা। মানে হাতের সংখ্যা প্রায় দুর্গারই কাছাকাছি।
গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মুম্বাদেবীর সেই শহরই মাতোয়ারা দেবী দুর্গাকে নিয়ে। শহরের মোড়ে মোড়ে তিনি অধিষ্ঠিতা। যদিও সে মূর্তি ঠিক বাঙালির চেনা রূপের নয়। আরব সাগরে সূর্য ডুবলেই সেই অম্বা মূর্তি ঘিরে শুরু হয়ে যায় আবালবৃদ্ধের ডান্ডিয়া-গর্বারাস। নবরাত্রির জৌলুসে নতুন মাত্রা দিচ্ছে এই শহরকে। আর তারই মধ্যে গত রবিবার থেকে শুরু হয়ে গেল বাঙালিদের নিজস্ব দশপ্রহরণধারিণীর আরাধনা।

'টাইমস পাওয়াই সর্বজনীন দুর্গোৎসব' [/caption]
পাওয়াইয়ে অবশ্য আরেকটি পুজোও শুরু হয়েছে গত পাঁচ বছর ধরে। আয়োজনে 'স্পন্দন' । ধুমধাম কিছু কম হলেও সে পুজোয় জড়িয়ে থাকে সুরূচি ও আন্তরিকতার ছাপ।
[caption id="attachment_43488" align="alignnone" width="702"]
পাওয়াই 'স্পন্দন'-এর পুজো[/caption]
আন্ধেরি ইস্টের অন্য পুজোগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পুনম নগরে 'মহাকালী সার্বজনীন দুর্গোৎসব সেবা সমিতি'-র পুজো'। আঠারো বছরের পুরনো এই 'এমএসডিএসএস'-র পুজো কমিটির পক্ষ থেকে পল্লব চ্যাটার্জী জানালেন, এখানকার পুজো হয় বিধিমত শুদ্ধাচারে, রামচন্দ্রের অকালবোধনের যথাসাধ্য রীতি মেনে। একশো আটটি শতদলেই সম্পন্ন হয় সন্ধিপুজো। পুজো উপলক্ষে নানান আনন্দ অনুষ্ঠানের পাশাপাশিই এরা চালাচ্ছেন 'শিক্ষা কি আশা' নামে দুস্থ ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক অনুদানের একটি প্রকল্প।
[caption id="attachment_43490" align="alignnone" width="1280"]
মহাকালী সার্বজনীন দুর্গোৎসব সেবা সমিতি'[/caption]
আন্ধেরি ওয়েস্টে হয় অনেকগুলো পুজো। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যাক্তির উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সে সব পুজো।
[caption id="attachment_43492" align="aligncenter" width="552"]
প্রগতি'-র পুজো[/caption]
আন্ধেরি স্টেশনের পাশেই ফিদাই বাগে 'প্রগতি'-র পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন চিত্রপরিচালক বিমল রায়। এখনও সে পুজোয় মানুষ ভিড় করে। উনিশ বছর আগে 'জুহু সার্বজনীন দুর্গোৎসব' শুরু করে গিয়েছিলেন বিখ্যাত সুরকার জগমোহন, মানে বাঙালির নিজের জগন্ময় মিত্র। প্রতিবছর এখানকার পুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ। এই পুজো সমিতি ভারত সেবাশ্রম সংঘকে অ্যাম্বুলেন্স দান বা প্রণবকন্যার আশ্রমকে আর্থিক সাহায্য দানের মতো কাজে নিজেদেরকে যুক্ত রাখে।
[caption id="attachment_43494" align="aligncenter" width="552"]
অভিজিতের পুজো[/caption]
লোখণ্ডয়ালায় হয় গায়ক অভিজিতের পুজো। সে পুজোও অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ এবং অবশ্য দ্রষ্টব্য। এখানে প্রতি সন্ধ্যার সঙ্গীতানুষ্ঠানে অংশ নেন বলিউডের বহু বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী।
[caption id="attachment_43498" align="aligncenter" width="552"]
শশধর মুখার্জির বাড়ির পুজো[/caption]
তা ছাড়াও আছে মুখুজ্জে বাড়ির পুজো। মুম্বাই চিত্রজগতের প্রবাদপুরুষ শশধর মুখার্জির বাড়ির পুজো এখন তিন পুরুষ ডিঙিয়ে কাজল-রানি-সর্বানীদের পুজো। সে পুজোয় মানুষের ঢল নামে। দেবী দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় তারকাদের এক ঝলক চাক্ষুষ করার ইচ্ছা নিয়েও মানুষ আসে দূরদূরান্ত থেকে। পাশেই তিলক উদ্যানে হয় 'জুহু ফিলানথ্রপিক অ্যাসোসিয়েশন'-এর পুজো।
https://www.youtube.com/watch?v=jmXDNsPRWEc&feature=youtu.be
আন্ধেরির দক্ষিণে খার ও বান্দ্রা। খারে রামকৃষ্ণ মিশনে হয় নিয়মনিষ্ঠ পুজো। মিশনের ঐতিহ্য মেনে হয় কুমারী পুজো। দিক্ষিত শিষ্যরা ছাড়াও সারা মুম্বাই ও শহরতলি থেকে মানুষ এখানে আসেন পুজা দেখতে, অঞ্জলি দিতে, প্রসাদ নিতে।
উনিশশো তিয়াত্তর সালে চিত্রজগতের বিশিষ্ট কিছু বাঙালি, যেমন শক্তি সামন্ত, বাসু চ্যাটার্জি, বাসু ভট্টাচার্য, মানিক দত্ত, রাহুল দেববর্মণ মিলে বান্দ্রায় শুরু করেছিলেন 'নতুন পল্লী সর্বজনীন দুর্গোৎসব'।
[caption id="attachment_43500" align="alignnone" width="702"]
নতুন পল্লী সর্বজনীন দুর্গোৎসব'[/caption]
এখানকার পুজো করতে পুরোহিত আসেন বাংলার ভাটপাড়া থেকে। ছেচল্লিশ বছর ধরে যে পুজো হচ্ছে, স্বাভাবিক ভাবেই তার আয়োজনে থাকবে ঐতিহ্যের ছোঁয়া। অন্য সব পুজোর মতোই প্রতিদিন দুপুরে দর্শনার্থীদের জন্য ভোগপ্রসাদের ব্যবস্থা ছাড়াও সন্ধ্যায় থাকে বিচিত্রানুষ্ঠান। এখানকার আর একটি বিশেষ ব্যাপার হল মুক্তমেলা। সলিল চৌধুরী নিজে যে মেলা শুরু করে গেছিলেন আজও তা তেমনি জনপ্রিয়।
কলকাতা না হলেও, বাঙালিদের জন্য প্যান্ডেল হপিং-এর যথেষ্ট সুযোগ রাখে মুম্বাই।
ফটো: সুপ্রিয় লাহিড়ি, পল্লব চ্যাটার্জী, রুদ্র মণ্ডল