Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
TB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রীছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

‘স্যুটওয়ালার শতবর্ষ’, সাহেবি পোশাকে শহরের ‘মন কি বাত’ জানে বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্স

তাঁদের ক্রেতা হাতেগোনা। এখনকার কর্ণধারের দাবি, ‘যাঁরা জানেন, তাঁরা আমাদের কাছেই আসেন। কারণ আমরা শুধুমাত্র পোশাক তৈরি করি না, সাহেবি পোশাকের সঙ্গে ক্রেতার চাহিদা, আবেগ ও পরিচয় মিশিয়ে দিতে পারি।’

‘স্যুটওয়ালার শতবর্ষ’, সাহেবি পোশাকে শহরের ‘মন কি বাত’ জানে বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্স

শেষ আপডেট: 13 February 2024 15:56

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘উত্তম কুমার তাঁর স্যুটের ফিটিংস নিয়ে খুব খুঁতখুতে ছিলেন। সামান্য লুজ ফিটিংস পছন্দ করতেন। আমাদের কাটও তেমনই হত। এখনও তাই। যেকারণেই বরাবরের ক্রেতা ছিলেন আমাদের। ওটাই আসলে আমাদের ইউএসপি’, বলছিলেন সদ্য একশো পেরনো ‘বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্সে’র তৃতীয় পুরুষ আলম আলি। যাত্রা শুরুর দিনটি ছিল, ২৮ জানুয়ারি, ১৯২৪। 

তাঁর কথায়, ‘স্যুট মূলত সাহেবি পোশাক। কিন্তু তার মধ্যেও ভারতীয় ঘরানাকে তুলে ধরেছি আমরাই। একারণে আমাদের ক্রেতাও সিলেক্টেড। দাদুই এসব তৈরি করে গিয়েছেন। আমরা তাঁকে অনুসরণ করছি মাত্র।’  শীতের মরশুম। শীতবস্ত্র বিক্রিও তুঙ্গে। সেইসঙ্গে চলছে বিয়ের মরশুমও। তাই ব্লেজার, জ্যাকেট ও স্যুটের চাহিদাও বেড়েছে। এখন বাঙালিরাও বিয়ের অনুষ্ঠানে স্যুট পরে। অন্য অনুষ্ঠান তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে আদ্যোপান্ত সাহেবি পোশাক পরার সুপ্ত বাসনা তো আছেই। এখন বহু রেডিমেড স্যুটের সম্ভার কলকাতায়। রয়েছে মাপ নিয়ে তৈরি করে দেওয়ার বহু সংস্থানও। বড় বড় বহুজাতিক পোশাক নির্মাতারা ঘাঁটি গেড়েছে শহরে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ঝাঁ চকচকে ফ্যাব্রিকে তৈরি থ্রি–পিস, টু–পিস তৈরি করে দিচ্ছে তারা। কিন্তু তাতে কিচ্ছু যায় আসে না শহরের সবথেকে পুরনো কোট–প্যান্টের দর্জি বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্সের। 

তাঁদের ক্রেতা হাতেগোনা। এখনকার কর্ণধারের দাবি, ‘যাঁরা জানেন, তাঁরা আমাদের কাছেই আসেন। কারণ আমরা শুধুমাত্র পোশাক তৈরি করি না, সাহেবি পোশাকের সঙ্গে ক্রেতার চাহিদা, আবেগ ও পরিচয় মিশিয়ে দিতে পারি।’

এই দোকান থেকেই বরাবর স্যুট তৈরি করাতেন উত্তম কুমার। গলাবন্ধ জ্যাকেট তৈরি করাতেন জ্যোতি বসু। এখন তাঁদের ক্রেতা সাংবাদিক এমজে আকবর, রাজনীতিবিদ শশী থারুর, সৌরভ গাঙ্গুলি, ইউসুফ পাঠান, রামিজ রাজার মতো ব্যক্তিত্ব। কলকাতায় এলেই একটা নতুন স্যুট নিয়ে যান শাহিদ আফ্রিদি। 

উল্টো দিকেই পার্ক হোটেল। সেখানে নামীদামী ব্যক্তিত্ব যাঁরাই আসেন, দোকানে একবার ঢুঁ মারেন। কলকাতাসহ দেশের বহু বিচারপতি, শিল্পী, অভিনেতা, নামী ব্যক্তিত্ব, বৈজ্ঞানিক, পাইলট, সেনাপ্রধানরা তাঁদের ক্রেতা। জানালেন মাঝবয়সি আলম আলি। 

দোকান যাঁর নামে, সেই বরকত আলি পাকিস্তানের শিয়ালকোটের বাসিন্দা ছিলেন। অভাবের সংসার। আচমকা সুযোগ পেয়ে খুবই অল্পবয়সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উর্দি তৈরির দর্জি হিসেবে কলকাতায় আসেন। ১৯১০ সালে পার্ক হোটেলের উল্টো দিকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঘোড়া রাখা হত। তার পাশেই একটি দোকান তৈরি করেন তিনি। তারপর আর পিছন ফিরে দেখতে হয়নি। এখন পার্ক হোটেলের কর্মীরাই নাকি পোশাকের কথা উঠলে অতিথিদের বলেন, সামনেই দর্জি বরকত আলির দোকান। 

গলাবন্ধ কোটসহ বিভিন্ন সাহেবি পোশাককে নিজস্ব শৈলীর সেলাই ও কাঁচির শিল্পে অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন বরকত আলি। সেই ট্রাডিশন এখনও চলছে। দোকানে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত কাঁচি। কাপড় কাটার বিষয়ে তাঁর বিশেষ নৈপুণ্য ছিল। এখনও তাঁর দেখিয়ে যাওয়া সেই ‘কাট’ই এখানকার ‘ইউএসপি’।  

আলম আলি বলছিলেন, ‘বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এখানে আসেন। কিন্তু তাঁদের নাম আমরা বলতে চাই না। কারণ এটা আমাদের প্রাইভেসি পলিসি। তবে পাকিস্তানের যাঁরাই আসেন, একটা স্যুট তৈরি করিয়ে নিয়ে যান। রাজ কাপুর, দিলীপ কুমার একাধিক বার এসেছিলেন আমাদের দোকানে। বাবার কাছে এসব গল্প শুনেছি। কলকাতার সবথেকে পুরনো দর্জির একটা স্যুটের জন্য বহু সেলিব্রিটি আসেন এখনও।’ 

আলম আলি আরও বললেন, ‘দুবাই, লন্ডনের প্রবাসী ভারতীয়রা তো বটেই, সেখানকার স্থানীয়রাও কলকাতায় এলে এখানে এসে আমাদের স্যুট কেনেন। ইতালি, বাংলাদেশের খানদানি ক্রেতারাও আসেন।’

তবে কলকাতায় শীত খুবই স্বল্পমেয়াদি। যেকারণে স্যুট তৈরি সময় সেকথা মাথায় রাখে বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্সের দর্জিরা। লেয়ারিং এমনভাবে দেওয়া হয়, যাতে ঠাণ্ডা কমে গেলেও সমস্যা না হয়। ট্রাউজার্সের মজুরি ৬০০ টাকা থেকে শুরু। স্যুট ৬ হাজার টাকা থেকে শুরু। শেরওয়ানি তৈরির মজুরি ৮ হাজার থেকে শুরু। সিঙ্গেল ব্রেস্ট ব্লেজারের মজুরি ৫ হাজার থেকে শুরু। কাপড়ের দাম আলাদা। জানালেন আলম আলি। 

শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন কলকাতায় এলেই তাঁদের দোকানে আসতেন। তখন তিনি স্কুলে পড়েন। বাবার কাছে শুনেছেন সে কথা। আলম আলি বললেন, ‘দেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পরও বেশ কয়েকবার এমএফ হুসেন আমাদের দোকানে কোট তৈরি করিয়েছেন। লোক এসে নিয়ে গেছে সেই পোশাক।’ জানালেন, তাঁর দাদু পাকিস্তান থেকে এসে কলকাতায় ব্রিটিশ আর্মির হয়ে কাজ করতেন। তারপর নিজের দোকান খুলে সাহেবি পোশাকে ভারতীয়ত্ব মেশালেন। কিন্তু দেশের সম্পদ হুসেন লন্ডনের রয়াল ব্রম্পটন হাসপাতালে মারা গেলেন নির্বাসনে। 

বললেন, ‘অভিজাত ক্যালকাটা ক্লাব একবার তাঁকে ঢুকতে দেয়নি ক্লাবের পোশাকবিধি না মান্য করায়। সাদা পোশাক, বিদেশি গাড়ি, দীর্ঘ তুলি, নগ্নপদ এবং তপ্ত বিতর্ক-সহকারে তিনি ভারতীয় শিল্পের বিচিত্র প্যাকেজিং। জীবদ্দশায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি আমাদেরই ক্রেতা ছিলেন।’ বলতে বলতে চোখ চকচক করছিল বরকত আলির নাতি আলম আলির।  

কলকাতায় এখন বহু নামী বিদেশি ব্র্যান্ডের স্যুট–কোট পাওয়া যায়। রেডিমেড। আপনাদের স্যুটের জন্য তো বেশ কয়েকবার ট্রায়াল দিতে হয়। মানুষের অত সময় আছে? আলম আলি বললেন, ‘আমরা শুধু স্যুট তৈরি করি না। মানুষের ইমোশন বুঝি। বিক্রি করাটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। সেলিব্রিটি ক্রেতা ছাড়া সাধারণ ক্রেতারাও আসেন বিয়ে বা বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য। আমাদের মজুরি বহু স্যুট মেকার্সদের থেকে বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা আসেন একটা ‘বরকত আলি’ স্যুটের জন্য। তাই সেই অনুষ্ঠান বা বিশেষ মুহূর্তটাকেই আমরা স্মরণীয় করে তুলতে চাই। আমাদের ডিজাইন ও শিল্পের মাধ্যমে। 

কলকাতার সবথেকে পুরনো দর্জি আপনারা। ক্রেতা তালিকায় এত বিখ্যাত লোকজন, দোকানের দরজা, বাইরের হোর্ডিং এত পুরনো কেন, কোনও বিজ্ঞাপনও তো দেন না। এর কারণ কী? আলম আলি বললেন, ‘পাশেই সেন্ট জেভিয়ার্স। সারাবছর আসা যাওয়ার মাঝে পড়ুয়ারা আমাদের দোকানের দিকে তাকাতে তাকাতে যায়। কলেজ শেষের পর একদিন আসে। একটা মানানসই স্যুটের অর্ডার দিতে। কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার প্রথমদিনে বরকত আলির তৈরি স্যুট। ওটাই আমাদের বিজ্ঞাপন।’


```