দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়েছে দেহ। হাতে ধরা ওয়াকিং ফ্রেম। সেটা ধরে কোনও রকমে খোলা বাগানে হাঁটছেন তিনি। খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন সামান্য দূরত্ব। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একটা করে পা ফেলতেও রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে তাঁকে বার্ধক্যের সঙ্গে। কিন্তু তবু হার মানছেন না। কেনই বা মানবেন! এক সময় তো কতই না কঠিন লড়াই করেছেন সত্যিকারের যুদ্ধের ময়দানে। আজ আবারও একটা যুদ্ধের দিন, হার তো মানা যাবে না!
এই অদম্য মনোবল নিয়েই, গল্পের বইয়ের হিরোর মতোই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দারুণ এক হার-না-মানা বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন একশো ছুঁই ছুঁই বৃদ্ধ, লন্ডনের টম মুর। প্রাক্তন ব্রিটিশ সেনার এই প্রাক্তন কর্তা শারীরিক ভাবে প্রায় অথর্ব হয়ে গেলেও, মনের দিক থেকে এখনও তরতাজা। ভুলে যাননি দায়িত্ববোধও। তাই নিজের বাগানে ১০০ পা এগিয়ে মানবতার দিকে নিজের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। ভাঙা কোমর নিয়ে, করোনা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ফান্ড চেয়ে হাঁটেন বৃদ্ধ।
আজ পূরণ হল তাঁর ১০০তম জন্মদিন। আজ সেই ফান্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা! সবটাই দান করা হবে ব্রিটেনের স্বাস্থ্য পরিষেবায়।

কিছু দিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেয়ে গেছিল তাঁর এই অনন্য চেষ্টার ভিডিও। গোটা দেশে আলোচিত হয়েছিল একজন বৃদ্ধ মানুষের এই চেষ্টা, সারা পৃথিবী জুড়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন মুর। সে সময় ভারত, বার্মা, সুমাত্রায় ব্রিটিশ সেনার হয়ে যুদ্ধ করেন। কোমর ভাঙার পরে দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা যেভাবে তাঁকে সারিয়ে তোলে, তাতে তিনি অনুপ্রাণিত হন। খানিক সেই তাগিদেই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রথম সারিতে দেশের যে সমস্ত চিকিৎসক নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো।

ব্রিটেনে কোভিড ১৯ আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২৭ হাজার জন মারা গেছেন। মারা গেছেন বেশ কিছু স্বাস্থ্য কর্মীও। এই পরিস্থিতিতে মুরের মূল লক্ষ্য ছিল, দেশের এই কঠিন পরিস্থিতিতে জনগণকে অর্থ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করা। ব্যক্তিগত ভাবে তিনি লক্ষ্য স্থির করেন এক হাজার পাউন্ড। ইতিমধ্যেই সেই দেশের খেলোয়াড়, অভিনেতা, গায়ক ও অন্যান্য তারকারাও এরকম প্রচার করেছেন।

কিন্তু মুরের মতো একজন শতবর্ষায়ু বৃদ্ধের এই চেষ্টা মানুষের মনে গভীর দাগ কেটেছে। প্রচুর মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসতে উদ্যোগী হয়েছে, অবিশ্বাস্য ভাবে জোগাড় হয়েছে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ। ভারতীয় মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা!
সেনাবাহিনীর উত্তরসূরিরা তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়ে অভিবাদন জানিয়েছেন। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ক্রিকেটার বেন স্টোকস। তিনি মুরের সুস্বাস্থ্য কামনা করেছেন। এই গোটা বিষয়ে খুশি হয়ে প্রাক্তন এই সেনা কর্তা বলেছেন, "আমরা সকলে এই যুদ্ধ একদিন জিতে যাব, রাতের পরে নতুন দিন আসবেই।"

তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য সেবার জন্য ব্রিটেনের মানুষের এমন সমবেত ভাবে এগিয়ে আসা দেখে মুর নতুন করে বাঁচার আলো দেখেছেন। সে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক মুরের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছেন, কোভিড ১৯-এর এই অন্ধকারময় দিনে মুর একজন আলোর স্তম্ভ। পৃথিবীর ইতিহাসে এই সমস্ত মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টম মুরের মত মানুষেরা চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়েই থেকে যান।