দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারা দিনে মাত্র এক কিলোগ্রাম প্লাস্টিক। ফেলে দেওয়া বোতল, ক্যারি ব্যাগ, থালা-গ্লাস-- সে নিজের বাড়ি থেকে হোক বা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া আবর্জনা, মিলিয়ে ঝুলিয়ে এক কেজি প্লাস্টিক জমা করতে পারলেই মিলবে এক কেজি চাল। প্লাস্টিক দূষণ রুখতে ফের অভিনব ভাবনা এ দেশেই।
অসমের স্কুলে বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়ে মাইনে দেয় কচিকাঁচারা। গড়পড়তা শিক্ষার বদলে শিশুদের দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশ তৈরির পাঠ দেন সে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা পারমিতা শর্মা ও মজিন মুখতার। ছত্তীসগড়ে তৈরি হয়েছে ‘গার্বেজ কাফে।’ এক কেজি প্লাস্টিকের বদলে মেলে পেট ভরা খাবার। প্লাস্টিক দূষণ রোধে অভিনব ব্যবস্থা নিচ্ছে ভারতীয় রেলও। এ দেশকে প্লাস্টিকমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে এবার এগিয়ে এল দক্ষিণও। এক কেজি প্লাস্টিকের বদলে এক কেজি চালের প্রকল্প শুরু হয়ে গেছে তেলঙ্গানায়। শুরুটা করেছেন তেলঙ্গানার মুলুগু জেলার জেলাশাসক সি নারায়ণ রেড্ডি। মুলুগু জেলা তো বটেই, এই অভিনব প্রয়াসে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছেন ভিন্ জেলার মানুষজনও। সরকারি প্রকল্প এখন সার্বিক রূপ নিয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দক্ষিণেই।

মুলুগুর প্রত্যন্ত গ্রামগুলি দিয়েই এই কর্মসূচি শুরু করেছিলেন জেলাশাসক। দিনভর আস্তাকুঁড় থেকে প্লাস্টিক জড়ো করে যাঁদের দিন কাটত তাঁরা তো বটেই, অভাবী অনেক পরিবারই চাল পাওয়ার আশায় সাড়া দেন এই প্রকল্পে। রাস্তাঘাটে, দোকান-বাজারে যত্রতত্র প্লাস্টিক পড়ে থাকতে দেখলেই কুড়িয়ে নিয়ে সোজা হাজির সরকারি আধিকারিকদের কাছে। মেপেঝুপে এক কিলোগ্রাম প্লাস্টিক জড়ো করতে পারলেই এক কেজি চাল। ভাঁড়ার তো ভরবেই, দিনের মজুরিটাও বাঁচবে। নারায়ণ রেড্ডি বলেছেন, ‘‘একটা-দু’টো গ্রাম দিয়ে শুরুটা হয়েছিল। এত মানুষের উৎসাহ দেখে মোট ১৭৪টি গ্রামে প্লাস্টিকের বদলে চালের অভিযান চালানো হয়েছে। নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে একদিনেই রাস্তাঘাটের অর্ধেকের বেশি প্লাস্টিকমুক্ত করে দিয়েছেন গ্রামবাসীরা।’’
জেলাশাসকের কথা, এই অভিযানের দু’টো দিক রয়েছে। এক, সরকারি আধিকারিকরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্লাস্টিক রোখার বার্তা দিচ্ছেন। দুই, অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গ্রামের হোমড়া চোমড়া ব্যক্তিরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে দূষণ রোধের কর্মসূচি নিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে, রাজ্য সরকারের তরফ থেকেই চাল ও নগদ টাকা দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। বদলে নেওয়া হচ্ছে জমা করা কেজি কেজি প্লাস্টিক। নারায়ণ রেড্ডি বলেছেন, গ্রামের অনেকেই আবার চালের বদলে নগদ টাকা নিতে চাইছেন। ছেলেমেয়ের স্কুলের খরচ, ভাঙা টালির চালের ছাদ সারাতে অভাবীদের টাকার প্রয়োজন খুব বেশি।

মুলুগু গ্রাম প্রায় প্লাস্টিকমুক্ত। আশপাশের গ্রামগুলিতেও শুরু হয়ে গেছে এই প্লাস্টিকের বদলে চালের অভিযান। জেলাশাসক জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনে প্রায় ২৫০টি এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। প্রথম দিনেই জমা হয়েছে ২৪০০ কিলোগ্রাম প্লাস্টিক। তার মধ্যে ফেলে দেওয়া বোতল এবং প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগের সংখ্যা বেশি। আজ শুক্রবার অবধি জমা করা প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ৩১,০০০ কিলোগ্রাম। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে মোট ৫০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
‘‘গত ১৫ দিনে ৪৫০ কুইন্ট্যাল চাল বিলি করা হয়ে গেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিকে দেওয়া হয়েছে নগদ ৬ লক্ষ টাকা। একমাসের মধ্যে গোটা তেলঙ্গানাকে প্লাস্টিকমুক্ত করার শপথ নিয়েছি আমরা,’’ বলেছেন জেলাশাসক নারায়ণ রেড্ডি।

‘প্লাস্টিক বর্জন করুন, ’ এই স্লোগান আমাদের পরিচিত। সরকারি ভাবনা, সরকারি প্রকল্পের বাইরে গিয়েও দিন থেকে রাত আমাদের জীবনজুড়ে থাকা প্লাস্টিক বাতিল করতে আমরা কী পদক্ষেপ নিয়েছি বা আগামী দিনেও নেবো, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আসুন দেখেনি প্লাস্টিক দূষণ রোধে আমাদের দেশেরই কয়েকটি বৃহত্তর পরিকল্পনা। যার মধ্যে কিছু ভাবনা দাগ কেটেছে দেশবাসীর মনেও।
অসমের ‘অক্ষর’—স্কুলের বেতন প্লাস্টিক বর্জ্য
গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরত্বে পামোহিতে গাছপালা ঘেরা এই স্কুলের নাম অক্ষর। বয়স বেশি নয়, যাত্রা শুরু হয়েছে বছর তিনেক আগে, ২০১৬ সালে। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এক দম্পতি নাম পারমিতা শর্মা এবং মজিন মুখতার। তাঁদের হাত ধরেই অক্ষরের পথ চলা। টাকাপয়সার বালাই নেই। বেতন হিসেবে পড়ুয়াদের জমা করতে হয় গাদা গাদা প্লাস্টিক, তা সে ক্যারি ব্যাগই হোক বা প্লাস্টিকের কোনও সামগ্রী। পড়ুয়াদের কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে, নিজের বাড়ির বা এলাকার, যেখানে যত প্লাস্টিক রয়েছে ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত সব কিছু নিয়ে এসে জড়ো করতে হবে স্কুলে। কোনও প্লাস্টিক পোড়ানো যাবে না। গড়ে সপ্তাহে ২৫টি করে প্লাস্টিকের যে কোনও সামগ্রী জমা করতেই হবে।

সপ্তাহে যত প্লাস্টিক জমা হয় স্কুলে, সেগুলো দিয়ে ইকো-ব্রিক (Eco-Brick) তৈরি করা হয় অক্ষরে। স্কুলের ভিতরেই প্লাস্টিক থেকে বায়োডিগ্রেডেবল সামগ্রী তৈরির অনুমোদন দিয়েছে নর্থ-ইস্ট এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। ছাত্রছাত্রীরাই বানায় এই ইকো-ব্রিক। একটা প্লাস্টিকের বোতলের ভিতরে অন্তত ৪০টি প্লাস্টিক বর্জ্য (ব্যাগ, অন্যান্য শুকনো প্লাস্টিকজাত সামগ্রী) ঠেসে মুখ বন্ধ করে তৈরি করা হয় এই ইকো-ব্রিক বা PET Bottle। যার ফলে ইট-ভাটার দূষণও রোধ করা যায়।
ছত্তীসগড়ে ‘গার্বেজ কাফে’
দেশের প্রথম ‘গার্বেজ কাফে’ তৈরি করেছে ছত্তীসগড়ের অম্বিকাপুর পুরসভা। যাঁরা শহর পরিষ্কার করেন রোজ সকালে, আবর্জনার কাগজগুলো কুড়িয়ে নেন সকাল জুড়ে, তাঁদের জন্য এই কাফের ব্যবস্থা। শহর খুঁজে এক কিলোগ্রাম প্লাস্টিক জড়ো করে জমা করতে পারলেই দিনের একবেলার খাবার মিলবে বিনামূল্যে। যদি কারও জমা করা প্লাস্টিকের পরিমাণ হয় ৫০০ গ্রাম, তাঁর জন্য এই কাফেতে থাকবে পেট পুরে জলখাবারের ব্যাবস্থা। গরিবের পেটও ভরবে, শহরও হবে প্লাস্টিকমুক্ত। প্লাস্টিক দূষণ রুখতে এই ভাবনা আগামী দিনে সার্বিকভাবে কার্যকরী হবে বলে জানিয়েছেন অম্বিকাপুর পুরসভার মেয়র মেয়র অজয় তিরকে।

প্লাস্টিকের ব্যবহার রুখতে কড়া পদক্ষেপ ভারতীয় রেলের
প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্রথম বড় পদক্ষেপ করেছে ভারতীয় রেল। রেলমন্ত্রকের তরফে নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়েছে, প্যাটফর্ম, প্যান্ট্রি কার, ট্রেনের ভিতরে-বাইরে কোথাও প্লাস্টিক ব্যবহার করতে পারবেন না রেলের কর্মী থেকে যাত্রীরা। ‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিসম কর্পোরেশন’ (আইআরসিটিসি)-কেও এমনই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫০ মাইক্রনের কম প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতেই রেলের এই অভিযান। বলা হয়েছে, সব কটি জোনে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। প্যান্ট্রি কার থেকে যে খাবার যাত্রীদের পাঠানো হয়, সেখানে প্লাস্টিক ব্যবহার করা চলবে না। ট্রেনে যাত্রীরাও যাতে প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ নিয়ে না ওঠেন, সেটা খেয়াল রাখতে হবে রেল কর্মীদের। খালি জলের বোতন ইতস্তত প্ল্যাটফর্মে ফেলতে দেখলেই জরিমানা করা হবে।