দ্য ওয়াল ব্যুরো: হাতে হাতে অবাধেই চলছে টাকার লেনদেন। মোবাইল-সহ দামি জিনিসেরও অনুপ্রেবেশ অগাধ।হাজার চেষ্টাতেও বন্দিশালায় বেআইনি সামগ্রীর অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যাচ্ছে না! শুধু আসামি নয়, এই কাজে জড়িত রয়েছেন কারা কর্মীরাও। এই লাগামছাড়া বেআইনি কাজকর্ম সমানে চলছে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। প্রেসিডেন্সির অবস্থাও তথৈবচ। শুধু নিয়মকানুনের একটু অদল-বদল, এই যা!
কয়েক মাস আগে আলিপুর সংশোধনাগারে বেশ বড়সড় পাচারচক্রের খোঁজ পান কারা অফিসারেরা। ধরা পড়েন জেলের এক ডাক্তার। তাঁর থেকে উদ্ধার হয় মাদক-সহ নানা রকম জিনিস। এ বার প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ভিতর টাকা পাচার করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ল জেলের হেড ওয়ার্ডার।
জেল সূত্রে খবর, এই ওয়ার্ডারের নাম প্রতাপ সিংহ। তার কাছ থেকে পাওয়া যায় ১৩ হাজার টাকা। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, বেশ কয়েকদিন ধরেই প্রতাপের আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছিল। অফিসারেরা কড়া নজর রেখেছিলেন তার উপর। গত রবিবার, সংশোধনাগারের ভিতর ঢোকা মাত্র তার তল্লাশি নিতে শুরু করেন অফিসারেরা। তখনই তার পকেট থেকে নগদ ১৩ হাজার টাকা উদ্ধার হয়। অফিসারেরা জানিয়েছেন, এই টাকা প্রতাপের মাধ্যমে কোনও আসামির কাছে পাচার হত। তাকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করেছেন কারা কর্তৃপক্ষ।
তবে, প্রেসিডেন্সি জেলে এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। গত সপ্তাহেই, প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের এক কর্মী পার্থ ভৌমিকের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, চার্জার, হেডফোন এবং বিদেশি সিগারেট উদ্ধার করেন কারা অফিসাররা।
ধরপাকড় সত্ত্বেও আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে যে দামি জিনিসের অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি সেটা ফের বোঝা গেল গত রবিবার। গোপাল তিওয়ারি নামে এক আসামির কাছে দামি মোবাইল ফোন দেখে চমকে ওঠেন কারা অফিসাররা। গিরিশ পার্কে গুলি চালানোর ঘটনায় অভিযুক্ত গোপাল। জেলের ভিতর জন্মাষ্টমীর পুজো চলার সময় মোবাইলে ভিডিও তুলতে দেখা যায় তাকে।মোবাইলটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু, জেল সূত্রে জানা গিয়েছে মোবাইল ছাড়াও তার কাছে নাকি আরও একটি স্মার্ট ফোন রয়েছে। সেটির এখনও খোঁজ পাননি অফিসারা।
দিন দিন, জেলের ভিতরেই অসামাজিক কাজকর্ম মাত্রা ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষদের দাবি, বিচারাধীন বন্দিদের যখন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় ও ফিরিয়ে আনা হয়, তখনই নানা রকম জিনিস জেলে ঢোকে। এর আগে বহুবার মোবাইল-সহ অনেক দামি জিনিস বন্দিদের থেকে উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু, জেলের ভিতরেও 'সেটিং' বলে একটা শব্দ বহুল প্রচলিত। বন্দিরাই জানান টাকা দিলেই মাদক থেকে দামি সিগারেট, এমনকি মোবাইল ফোনের বিক্রিও অবাধেই চলে জেলের ভিতর।
এক অফিসারের কথায়, খুনের আসামি রসিদ আলাম ওরফে গব্বরকে আলিপুরে নিয়ে আসার পরে দেখা যায় বাইরের জগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ অনেকটাই বেড়ে গেছে। মধ্য-কলকাতা তালতলা থানা এলাকার খুনের আসামি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি গব্বর। প্রথমে সে ছিল দমদম কেন্দ্রীও সংশোধনাগারে। সেখান থেকে তাকে স্থানান্তরিত করা হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। সেখান থেকেই বাইরে অপরাধ জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত সে।
সাধারণত, সংশোধনাগারে কোনও বন্দির সঙ্গে দেখা করার নিয়ম রয়েছে। দু’জনের বেশি একই সময়ে সাক্ষাৎ করা যায় না। কিন্তু, গব্বরের ক্ষেত্রে দেখা যায় উল্টো নিয়ম। একের পর এক পরিচিত তার সঙ্গে দেখা করে। পরে তদন্ত করে অফিসাররা দেখেন, বাইরে থেকে মোটা অঙ্কের টাকা গব্বরের কাছে পৌঁছয়। সেই টাকা দিয়ে জেলের ভিতর নানা অপরাধমূলক কাজ করে সে। জেলের ভিতর বসে বাইরে তোলাবাজির কাজের সঙ্গেও জড়িত সে। তার কাছে রয়েছে দু’টি দামি স্মার্টফোন।
এতএব, সর্ষের মধ্যেই ভূত। জেলের ভিতর পাচার, টাকা লেনদেনের ঘটনায় জড়িত রয়েছেন কারা কর্মী থেকে উচ্চ পদের অফিসাররাও। অভিযোগ, কোনও কারা কর্মীর অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু, কোনও অফিসার এই কাজে জড়িত হলে তাঁকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করার বদলে স্থানান্তরিত করা হয় অন্য সংশোধনাগারে। এ ভাবেই আইনের ফাঁক গলে হু হু করে বেনো জল ঢুকে পড়ছে সংশোধনাগারগুলিতে।