দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাফায়েল চুক্তি নিয়ে বুধবার লোকসভায় বিতর্ক হওয়ার কথা ছিল। তার আবহ তৈরি করতে এ দিন সকালেই সংসদ চত্বরে বোমা ফাটিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতারা। একটি অডিও টেপ ফাঁস করে জানিয়েছিলেন, প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তথা বিজেপি-র প্রবীণ নেতা ও বর্তমানে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর পার্রিকর দাবি করেছেন, তাঁর বেডরুমে লুকোনো রয়েছে রাফায়েল যুদ্ধ বিমান কেনা সংক্রান্ত চুক্তি।
তাতেই হই হই পড়ে গিয়েছিল সর্বভারতীয় রাজনীতিতে। এতে অক্সিজেন পেয়ে দুপুরে লোকসভায় রাফায়েল-বিতর্কে অংশ নিয়ে সেই টেপ ফাঁস করে দিতে চাইলেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। যদিও লোকসভার তাঁকে সেই অনুমতি দেননি লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন। তবে বলেন, অডিও টেপটি সত্যি প্রমাণ করে দিতে পারলে তবেই তা শোনানোর অনুমতি দেওয়া হবে। স্বাভাবিক ভাবেই তা সম্ভব ছিল না। এই অবস্থায় ট্রেজারি বেঞ্চে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেন, টেপটি জাল। তাই সাহস করে সেটাকে সত্যি প্রমাণ করে দেখাতে পারলেন না রাহুল।
কিন্তু সে কথা বললে কী হবে! বুধবার দিল্লি রাজনীতির অলিন্দ জুড়ে দিনভর বেজে চলল সেই টেপ। কী ছিল তাতে?
দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী যখন মনোহর পার্রিকর, তখন রাফাল নিয়ে ফ্রান্সের দাসো এভিয়েশনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল নয়াদিল্লির। পার্রিকর এখন গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী। অডিও টেপে শোনা যাচ্ছে গোয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রী বিশ্বজিৎ রানে ফোনে কাউকে জানাচ্ছেন যে, গোয়ায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওই দিন খুব অশান্তি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মনোহর পার্রিকর এক সময় কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, রাফায়েল নিয়ে সব তথ্য ও নথি তাঁর বেডরুমে লুকোনো রয়েছে। ফোনের অন্য প্রান্তে কে ছিলেন, তা জানা যায়নি। তবে এ কথা শুনেই তিনি বলেন, কী বলছেন কী! তাই! বিশ্বজিৎ তখন বলেন, সেটা জানাতেই তো আপনাকে ফোন করেছি। দরকার হলে মন্ত্রিসভার অন্য কোনও সদস্যকে ফোন করে খোঁজ নিতে পারেন। এর পরই গোয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রী ফোনে বলেন, হতে পারে রাফায়েল নিয়ে দল ও কেন্দ্রের সরকারের শীর্ষ নেতাদের চাপে রাখতেই এ সব করেছেন মনোহর পার্রিকর।
লোকসভায় দাঁড়িয়ে রাহুল প্রশ্ন তোলেন, প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দেরাজে রাফায়েল-নথি কেন? রাফায়েল নিয়ে কী সওদা হয়েছে? সেই সঙ্গে খোঁচা দিয়ে রাহুল বলেন, আগে ভাবতাম যে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। এখন দেখছি ডালটাই কালো।
রাফায়েল বিতর্কে অংশ নিয়ে এরই পাশাপাশি এ দিন প্রশ্ন বাণে সরকারকে জর্জরিত করে দিতে চান রাহুল। লোকসভায় তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছিলেন না। ট্রেজারি বেঞ্চের দাঁড়িয়ে এআইডিএমকে-র সাংসদরা আবার চিৎকার করে স্লোগান জুড়েছেন। তাঁদের আড়ালে পড়ে গিয়েছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারমন।
পরিস্থিতি যখন এমন তখন মোদী ও নির্মলাকে তীব্র কটাক্ষ করে রাহুল বলেন, রাফায়েল সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সাহস প্রধানমন্ত্রীর নেই। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও লুকিয়ে রয়েছেন। কিন্তু দেশ জবাব চাইছে যে। তাঁর কথায়, রাফায়েল নিয়ে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে আমার। এক, চুক্তির প্রক্রিয়া সংক্রান্ত। দ্বিতীয়, কী ভাবে রাফায়েলের মূল্য নির্ধারণ করা হল? এবং তৃতীয়ত, কে কত পয়সা খেয়েছে আর কী কী স্বজনপোষণ হয়েছে?
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে রাহুল যখন আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রশ্নের ঝড় তুলছেন তখন বিজেপি শিবির আগের মতো পাল্টা আক্রমণাত্মক ছিল না। যেন বিস্ময়ের সঙ্গে এই সেই রাহুল তো! প্রবীণ এক রাজনীতিকের মতে, টুজি মামলায় কংগ্রেসেরও এমনই হয়েছিল।
রাহুল এ দিন বলেন, দেশের বায়ু সেনা কর্তারা ১২৬ টি রাফায়েল কেনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ইউপিএ জমানায় সেটাই ঠিক হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেন তা কমিয়ে ৩৬টি রাফায়েল কেনার সিদ্ধান্ত নিলেন? কেন সে ব্যাপারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটিতে কোনও আলোচনা হল না? কেন এক তরফা সিদ্ধান্ত নিলেন নরেন্দ্র মোদী?
কংগ্রেস সভাপতির আরও প্রশ্ন-ইউপিএ জমানায় দাসো এভিয়েশনের কাছ থেকে একেকটি রাফায়েল যুদ্ধ বিমান ৫২৬ কোটি টাকায় কেনার কথা হয়েছিল। মোদী কেন সেই একই বিমান ১৬০০ কোটি টাকা দামে কিনলেন? দাম বাড়ার পিছনে যুক্তি কী?
তা ছাড়া কেন ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ওঁলাদ বললেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশেই অনিল আম্বানির সংস্থাকে রাফাল বরাত দেওয়া হয়েছিল। কেন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডকে (হ্যাল) বরাত দেওয়া হল না। অথচ অতীতে মিরাজ, মিগ ২৭ যৌথ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা হ্যালের রয়েছে।
সর্বোপরি রাহুল বলেন, অনিল আম্বানিকে কেন বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী? বরাত পাওয়ার মাত্র দশ দিন আগে তাঁর প্রতিরক্ষা কোম্পানির পত্তন করেছিলেন অনিল আম্বানি। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। তাঁর সংস্থা ৪৮ হাজার কোটি টাকা লোকসানে চলছে। অনিল আম্বানির পকেটে কেন ৩০ হাজার কোটি টাকা গুঁজে দেওয়া হল?
রাহুলের এই খোঁচায় জেটলি-রবিশঙ্কর প্রসাদ-নির্মলা সীতারমনরা যে চটছিলেন তা দৃশ্যত স্পষ্ট ছিল। পরে বিতর্কে অংশ নিয়ে রাহুলের বিরুদ্ধে চাঁচাছোলা আক্রমণ শানাতে শুরু করেন জেটলিও। (সেই জবাব এখনও চলছে। আমরা পরে আপডেট করবো।)
রাফায়েল নিয়ে এই চাপানউতোরেই বুধবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। সন্দেহ নেই সাধারণ নির্বাচনের আগে এই চাপানউতোর শিগগির নেমে আসবে রাস্তায়।