
শেষ আপডেট: 31 August 2018 18:30
এক কথায় বলতে গেলে, নয়া স্বাদে পুরনো পার্ক স্ট্রিটকে ফিরিয়ে এনেছে ‘চ্যাপ্টার টু’। রেস্তোরাঁর আনাচ-কানাচে বিশ শতকের মাঝপর্ব থেকে ৬০-৭০ এর দশকের পার্ক স্ট্রিটের আবহ। স্বাদে-গন্ধেই তার আবেদন। যে অ্যাংলো ঘরানা এক সময় ডাল-ভাতের বাঙালিকে পর্ক-স্টেকে বাঁচতে শিখিয়েছিল তাকেই টাইম মেশিনে চাপিয়ে নয়া ফ্লেভারে হাজির করেছেন দুই কর্ণধার ভাই শিলাদিত্য এবং দেবাদিত্য চৌধুরী।
দক্ষিণ কলকাতার জনপ্রিয় দু’টি রেস্তোরাঁ ‘অওধ ১৫৯০’ এবং ‘চাওম্যান’-
এর জন্মও হয়েছে শিলাদিত্য এবং দেবাদিত্যর হাত ধরেই। কোথাও লখনউ ঘরানার আমেজ তো কোথাও চিনা রেস্তোরাঁর স্বাদ। ভোজনরসিক শিলাদিত্য এবং দেবাদিত্য তাই অকপটে বলেছেন, ‘‘আমাদের জার্নিটা শুরু হয় মিউজিক দিয়েই। তবে, আমাদের প্যাশন হল ‘ফুড’। আমজনতাকে পুরনো দিনের কলতাকায় নিয়ে যাবে চ্যাপ্টার টু। সঙ্গে অবশ্যই থাকবে ভাল মিউজিক।’’
পুরনো কলকাতাকে হারিয়ে ফেলেছি বলে যারা বিলাপ করেন, সেই প্রবীণ ক্যালকাটানদের দগদগে ক্ষতে প্রলেপ দেবে ককটেলের সাহচর্যে ল্যাম্ব চপ। প্রন ককটেলের সঙ্গে যদি সিফ্যুড স্যুপ বা টেট্রাজিনির দেখা মেলে তাহলে বাঙালি মন শান্ত হয়। পর্ক চপ বা সাতোব্রিয়াঁ স্টেকের মতো রেসিপিতে রয়েছে অনেক কসমোপলিটন রসনা-তৃপ্তির হাতছানি। টাটকা রোজমেরি আর রেড ওয়াইনে মজানো নানান টাটকা মশলার সুগন্ধে ভরপুর ডাক রোস্ট স্বাদ কোরককে উল্লসিত করবেই।

শাকাহারিদেরও নিরাশ করবে না ‘চ্যাপ্টার টু’। ক্রিম অব টোম্যাটো স্যুপ এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে এ কথা হলফ করে বলতে পারি। তবে বাঙালির যে কোনও খাবারেরই শেষ পাতে মিষ্টি চাই ই চাই। না হলে ব্যাপারটা হয় অনেকটা শেষ হয়েও হইল না শেষের মতো। সে ক্ষেত্রে ‘চ্যাপ্টার টু’ স্পেশাল চিজ কেক বা ক্যারামেল কাস্টার্ড মুখে লেগে থাকবে
আরও পড়ুন: বিরিয়ানি-কাবাবে নবাবি আভিজাত্য, ’অওধ ১৫৯০’-এ মন কাড়ে আখতারির গান
পুরোপুরি ‘রেট্রো’ কলকাতার আমেজ তৈরি করতে অবশ্য কম পরিশ্রম করতে হয়নি শিলাদিত্য ও দেবাদিত্য চৌধুরীকে। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত আর্ট ডিরেক্টর নীতিশ রয়কে উড়িয়ে এনে গোটা রেস্তরাঁর থিম ডিজাইন করা হয়েছে। ওয়েটার ও 
মাস্টারদের জন্য বিশেষ পোশাক ডিজাইন করেছেন খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পল। দেওয়াল জুড়ে পুরনো দিনের হলিউড স্টারদের থ্রি-ডাইমেনশনাল ছবি আর বার কাউন্টারে ঢাউস ক্যাডিলাক গাড়ির আদল কলোনিয়াল কলকাতারই আবেশ। সঙ্গে সপ্তাহান্তে লাইভব্যান্ডের সুর-মূর্ছনা।
এক সময় পার্ক স্ট্রিট আলো করে ছিল ‘স্কাইরুম’, আর চৌরঙ্গীতে ‘ফুডস্কেপ’। অ্যাংলো ঘরানাকে বাঙালির স্বাদ ও রুচির সঙ্গে পরিচয় করায় তারাই। তার আগে অবশ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আশ পাশেই ইতালির বাসিন্দা অ্যাঞ্জেলো ফারপো কলকাতায় গড়ে তুলেছিলেন ‘ফারপো রেস্তোরাঁ'। বিদেশি কুইসিনের লোভে তখন সেখানে ইতালিয়ান, ব্রিটিশদের আনাগোনা ছিল বেশি। ১৯৬০ সালেই ঝাঁপ ফেলে দেয় ফারপো।
১৯৪০ থেকে ১৯৭০ সালের পার্ক স্ট্রিট ছিল খাবার-সঙ্গীতের আখড়া। রাত বাড়লেই জমে উঠত খানা-পিনা-গান-বাজনার মজলিশ। তার পর ধীরে ধীরে ‘মোকাম্বো’, ‘ব্লু-ফক্স’-এর হাত ধরে কন্টিনেন্টালের নতুন ছোঁয়াচ পায় বাঙালি।

স্কাইরুম-এর ঝাঁপ বন্ধ প্রায় আড়াই দশক। এখন অনেকটা পাল্টেছে পার্ক স্ট্রিট। সেই রাতের আমেজ এখন আর নেই। তাই, পুরনো কলকাতার সেই নস্টালজিয়াকে ফের উস্কে দিতেই ‘চ্যাপ্টার টু’-এর এই উদ্যোগ-আয়োজন।
স্বাধীনতা দিবসে ভোজের থালায় দেশি-ফিউশন-ককটেল
স্বাদে-গন্ধে ৭৫ বছর পার, ‘সিরাজ গোল্ডেন রেস্তোরাঁ‘র আনাচ-কানাচে লখনউ সূর্যাস্তের আভা
‘চ্যাপ্টার টু’ রেস্তোরাঁ তাই গড়েই উঠেছে স্কাইরুমের প্রেরণায়। শহরের সাহেবিয়ানায় আরও একটু আস্কারা দিতে সাবেক পার্ক স্ট্রিটের নস্ট্যালজিয়ায় মশগুল মণিস্কোয়ারের ‘চ্যাপ্টার টু’। সারা বছরই ‘চ্যাপ্টার টু’ পর্ক-টার্কি-বিফ-ল্যাম্বময়। সঙ্গে অবশ্যই লাইভ জ্যাজ এবং ব্লুজ।
এলভিস প্রেস্টলি বা জন লেননের সুর শুনতে শুনতে পর্ক চপের সঙ্গে সমুদ্রনীল ককটেলে চুমুক। মনে মনে বলে উঠতেই হবে স্বার্থক জনম আমার। বিদেশি ভদকার সঙ্গে একটুকরো লেবু, লেমোনেড আর ব্লু কারাকাও লিকার। এই স্বাদেই মন ও জিভ দুইই মজে যাবে।
ভোজনরসিক দুই কর্ণধার ভাইও তাই বলেছেন, ‘’এটাই পুরনো কলকাতা। আমাদের ছোটবেলায় পার্ক স্ট্রিট এমনটাই ছিল।’’ অতএব, ফুড-ফান-লাইফ-মিউজিক.. একবার বলতেই হবে...চিয়ার্স!