দ্য ওয়াল ব্যুরো : সরকারপক্ষ আস্থাভোট ঠেকিয়ে রেখেছিল বেশ কয়েকদিন। শোনা যাচ্ছিল, কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী ভিতরে ভিতরে চেষ্টা করছেন যাতে বিদ্রোহী বিধায়কদের কয়েকজনকে সরকারপক্ষে টেনে আনা যায়। স্পিকার কে আর রমেশ কুমারের নামেও অভিযোগ উঠেছিল, তিনি আস্থাভোট নিতে দেরি করছেন। সরকার যাতে গরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে তার সুযোগ করে দিচ্ছেন। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাত্র ছয় ভোটে হেরে গেলেন কুমারস্বামী।
ঠিক কী কারণে ১৫ মাসের মধ্যে গরিষ্ঠতা হারাল কুমারস্বামী সরকার? পর্যবেক্ষকরা তার পিছনে ১০ টি কারণ দেখিয়েছেন।
প্রথম কারণ : ২০১৮ সালে কর্ণাটক বিধানসভার ভোটে কেউ গরিষ্ঠতা পায়নি। ২২৪ আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় বিজেপি ছিল একক গরিষ্ঠ দল। তাদের বিধায়কের সংখ্যা ছিল ১০৪। কংগ্রেসের বিধায়ক ছিলেন ৭৮ জন। জেডিএস পেয়েছিল ৩৭ টি আসন। তখন লোকসভা নির্বাচনের এক বছর বাকি ছিল। কংগ্রেস নেতৃত্ব চাইছিল, বিরোধী জোট গঠনের প্রস্তুতি শুরু হোক। সেজন্য তারা জেডিএসকে সমর্থনের প্রস্তাব দেয়। ক্ষমতা থেকে ১০ বছর বাইরে থাকার পরে কুমারস্বামীর দল সাগ্রহে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে। কিন্তু ভোটে কেউ গরিষ্ঠতা পায়নি বলে শুরু থেকেই সরকার ছিল নড়বড়ে।
দ্বিতীয় কারণ : প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, কংগ্রেস ও জেডিএসের মধ্যে যথেষ্ট বিরোধ আছে। কংগ্রেসের প্রভাব আছে কর্ণাটকের সর্বত্র। জেডিএসের প্রভাব কেবল ‘ওল্ড মাইসুরু’ অঞ্চলে। নানা জাত ও ধর্মের মানুষ কংগ্রেসকে ভোট দেন। কিন্তু জেডিএসের ভোট ব্যাঙ্ক কেবল ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের মধ্যে। এত তফাৎ থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস ও জেডিএস জোট বেঁধেছিল। জোট যে টিকবে না, তা আগেই বুঝেছিলেন অনেকে।
তৃতীয় কারণ : গত বছর কর্ণাটকে বিধানসভা ভোটের ফলাফল বেরোন শেষ হওয়ার আগেই কংগ্রেস হাইকম্যান্ড ঘোষণা করে দেয়, তারা জেডিএসের সঙ্গে জোট বাঁধছে। এক্ষেত্রে রাজ্যের নেতাদের সঙ্গে আলোচনাই করা হয়নি। কর্ণাটকে যিনি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা, সেই সিদ্দারামাইয়ার সঙ্গে গৌড়া পরিবারের সম্পর্ক ভালো নয়। সেই পরিবারই জেডিএস দলটিকে চালায়। অনেকের মতে, হাইকম্যান্ডের চাপে সিদ্দারামাইয়া জেডিএসের সঙ্গে জোট মেনে নিলেও ভিতরে ভিতরে সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।
চতুর্থ কারণ : জেডিএসের বিধায়কের সংখ্যা কংগ্রেসের অর্ধেক। অথচ মুখ্যমন্ত্রীর পদ পেয়েছিলেন জেডিএসের কুমারস্বামী। তাঁর দলের নেতারা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক পেয়েছিলেন। কুমারস্বামীর ভাই এইচ ডি রেভান্না কংগ্রেসের অনেক মন্ত্রীরও দফতর বদল করেছেন বলে জানা যায়। এতে কংগ্রেসের একাংশ সরকারের ওপরে অসন্তুষ্ট হয়েছিল।
পঞ্চম কারণ : কর্ণাটকের বেশ কয়েকটি জেলায় ভোটের আগে কংগ্রেস ও জেডিএসের কর্মীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই করেছেন। ভোটের পরে নেতাদের চাপে জোট হয়েছে বটে কিন্তু নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে বিরোধ থেকেই গিয়েছে।
ষষ্ঠ কারণ : কর্ণাটকে লোকসভা আসনের সংখ্যা ২৮। ভোটের আগে অনেকে ধরে নিয়েছিলেন, কংগ্রেস-জেডিএস জোট ভালো ফল করবে। বাস্তবে এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ২৬ টি। কংগ্রেস ও জেডিএস একটা করে আসন পেয়েছে। তখনই অনেকে বুঝেছিলেন, জোট সরকার আর বেশিদিন নেই।
সপ্তম কারণ : বিজেপি মনে করে, কর্ণাটক হল ‘গেটওয়ে টু দ্য সাউথ’। লোকসভা ভোটে বিপুল জয়ের পরে কর্ণাটক দখলে নেমে পড়েছিলেন স্থানীয় বিজেপি নেতারা। তাঁরা জানতেন, ভালো মন্ত্রক না পাওয়ায় কংগ্রেসের অনেক নেতাই মনে মনে অসন্তুষ্ট। এই সুযোগটাই নিয়েছে গৈরিক ব্রিগেড।
অষ্টম কারণ : কর্ণাটকে বিজেপির শীর্ষ নেতা বি এস ইয়েদুরাপ্পা চেয়েছিলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্ষমতা দখল করতে। এমনিতে বিজেপিতে ৭৫ বছর বয়সের পরে কোনও নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয় না। কিন্তু ইয়েদুরাপ্পার বয়স ৭৬। রাজ্যে জনপ্রিয়তা দেখে তাঁকে সরাতে সাহস পায়নি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
নবম কারণ : কর্ণাটক সরকারের মোট রাজস্বের অর্ধেকই আসে বেঙ্গালুরু থেকে। সেখানে আছে ২৮ টি বিধানসভা কেন্দ্র। শহরে আছে বহু তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা। সেই সঙ্গে রিয়েল এস্টেটেরও বড় বাজার বেঙ্গালুরু। জেডিএসের ভোট ব্যাঙ্ক মূলত গ্রামে। অভিযোগ, তারা বেঙ্গালুরু শহরের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি।
দশম কারণ : কর্ণাটকে গৌড়া পরিবারের ছ’জন রাজনীতিতে আছেন। রাজ্যের মানুষের ধারণা হয়েছিল, তাঁরা লোভী। আগে কুমারস্বামী ঘন ঘন গ্রামাঞ্চলে যেতেন। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। কিন্তু গত বছর সরকার গঠনের পরে দেখা গেল, তিনি ফাইভ স্টার হোটেলেই সময় কাটাতে পছন্দ করছেন বেশি। কংগ্রেস নেতারা অনেকে ভেবেছিলেন, তাঁদের বেশি আসন থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার ভাগ বেশি পেয়েছে গৌড়া পরিবার। ফলে সরকারপক্ষের মধ্যে বিদ্রোহ ঘনিয়ে উঠছিল।