
শেষ আপডেট: 19 January 2024 20:39
অযোধ্যায় রাম মন্দিরের সঙ্গে কলকাতা যে এভাবে জুড়ে যাবে কে জানত!
আর ৭২ ঘণ্টা পর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে নতুন তৈরি রাম মন্দিরের। তার আগে শুক্রবার প্রাতঃরাশের পর কলকাতার ট্যাঁকশালের দুই বুলিয়ন অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে এখানে যে দেখা হয়ে যাবে তাই বা কে ভেবেছিল! এও এক অদ্ভূত সংযোগ।
ভারতবর্ষের হিন্দু মন্দির ও ধর্মস্থানগুলোয় সোনা, রূপো, হিরে-পান্না সহ দামি ধাতু এবং পাথর দানের রীতি বহুদিনের। এই দান ভারতীয় মনন ও সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে রয়েছে সহস্র বছর ধরে। তাই রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের কর্তারাও ধরে নিয়েছেন অযোধ্যায় রামলালার মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর সারা দেশ থেকে ভক্তরা এসে প্রচুর দান ধ্যান করবেন। পুরুষোত্তম রামের নিজের আলয় হচ্ছে। এ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ধরে নেওয়া হচ্ছে, ভগবান রামের রাজকীয় কোষাগারে জমা পড়বে প্রচুর সোনা দানা। তা সে গয়না হতে পারে বা মূল্যবান ধাতুর কয়েন।
এখন প্রশ্ন এই সব মূল্যবান ধাতুর কী হবে? কোথায় রাখা হবে? এতো আর ত্রেতা যুগের অযোধ্যা নয় যে সূর্যবংশের তোষাখানা রয়েছে এখানে। তাহলে উপায়?
ঠিক এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েই ডাক পড়েছে কলকাতার ট্যাঁকশালের। রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট এবং কেন্দ্রের সরকার তথা অর্থ মন্ত্রক স্থির করেছে, দানের বহু মূল্যবান সব ধাতু কলকাতার ট্যাঁকশালে নিয়ে যাওয়া হবে। তাই কলকাতার ট্যাঁকশাল থেকে দুই অফিসার এসেছেন অযোধ্যায়। তাঁরা দুজনেই বুলিয়ন অ্যাকাউন্ট্যান্ট। এক জনের নাম সুজয় বড়ুয়া। অন্যজন হলেন মলয় দত্ত। শুক্রবার প্রাতঃরাশের সময়ে দেখা হয়ে গেল তাঁদেরই সঙ্গে। গোটা বিষয়টা বুঝিয়ে বললেন তাঁরা।
জানিয়ে রাখা ভাল, কলকাতায় ট্যাঁকশালের সুদীর্ঘ ইতিহাস। হয়তো অনেকেই সেই ইতিহাসের খোঁজ রাখেন না। ডালহৌসিতে এখন যেখানে জিপিও রয়েছে, তার পাশেই সিপাহী বিদ্রোহের বছরে অর্থাৎ ১৭৫৭ সালে প্রথম ক্যালকাটা মিন্ট তৈরি হয়। দ্বিতীয় ট্যাঁকশালটি তৈরি হয়েছিল গার্ডেনরিচ এলাকায়। সেই ট্যাঁকশালের জন্য বিলেত থেকে মেশিন আনা হয়েছিল। তার পর স্ট্র্যান্ড রোডে আরও একটি ট্যাঁকশাল তৈরি হয় ১৮২৯ সালে। তবে এই তিন ট্যাঁকশাল বন্ধ করে শেষমেশ আলিপুরে বর্তমান মিন্টের ভূমি পুজো হয় ১৯৩০ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে এখানে কাজকর্ম বন্ধ ছিল। পরে ১৯৫০ সাল থেকে এই ট্যাঁকশাল পুরোদস্তুর কাজ শুরু করে দেয়।
সুজয় বড়ুয়া ও মলয় দত্ত দ্য ওয়ালকে এদিন জানান, আপাতত তাঁরা পনেরো দিনের জন্য অযোধ্যায় এসেছেন। তাঁদের কাজ হল, ভক্তদের দানে যত মূল্যবান ধাতু এখানে জমা পড়বে, তার একটা প্রাথমিক হিসাব করা। তার পর সেগুলো কলকাতার ট্যাঁকশালে পাঠিয়ে দেওয়া।
সেই সব মূল্যবান ধাতু নিয়ে কলকাতার ট্যাঁকশাল কী করবে?
বুলিয়ন অ্যাকাউন্ট্যান্ট মলয় দত্তর কথায়, “কলকাতার ট্যাঁকশালে একটি রিফাইনারি রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধাতু আলাদা করে সেগুলো গলিয়ে ফেলা হবে। তার পর সেগুলিকে ধাতব ‘বার’-এ পরিণত করা হবে।”
বিষয়টা আরও ব্যাখ্যা করে সুজয় বড়ুয়া জানান,“সোনার নানা ধরণের পিউরিটি থাকে। কোনওটা ষোলো আনা খাঁটি অর্থাৎ ২৪ ক্যারেট। কোনওটা বা তার থেকেও কম। এই সব ধাতু গলিয়ে খাঁটি ধাতু কতটা পাওয়া যায় তার মূল্যায়ন হবে। ধরা যাক, ১ কেজি দানের সোনা গলানো হল, তা থেকে ৯৫০ গ্রাম খাঁটি সোনা পাওয়া গেল। সেই খাঁটি সোনাই বার হিসাবে রাখা হবে। তাই ধাতুগুলো গলানোর আগে ট্যাঁকশালের অ্যাসেসমেন্ট বিভাগ সেগুলো মূল্যায়ন করে দেখবে।”
তাঁদের কথায়, সম্ভবত এই সব ধাতব বার এর পর চলে যাবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে। তারপর কী হবে সেটা তাঁদের জানা নেই। কারণ, এ ব্যাপারে রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সঙ্গে কেন্দ্রের সরকারের কী চুক্তি হয়েছে সেটা তাঁদেরকে বলা হয়নি। তাঁরা শুধু এটুকুই জানেন যে এই মূল্যবান ধাতুগুলো ট্যাঁকশালে নিয়ে যেতে হবে।
সুজয়বাবু আরও বলেন, “মূলত সোনা, রূপোই দানে বেশি জমা পড়ে। তা ছাড়া প্ল্যাটিনামও দেন অনেকে। প্রাথমিক ভাবে আমরা পনেরো দিনের জন্য এসেছি। এর পর হয়তো আবার অন্য টিম আসবে।”
কলকাতা ট্যাঁকশালের ধাতু গলানোর অভিজ্ঞতা বহুদিনের। সুজয়বাবু জানিয়েছেন, প্রত্যক্ষ কর দফতর তথা কাস্টমস যে সব সোনা দানা বাজেয়াপ্ত করে, সেগুলো মামলার নিষ্পত্তির পর ভারত সরকারের সম্পত্তি হয়ে যায়। এই সব মূল্যবান ধাতুও কলকাতা ট্যাঁকশালে যায়। তার পর সেখানে গলিয়ে বার বানিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
দেশে চারটি ট্যাঁকশাল রয়েছে। এর মধ্যে কলকাতা ট্যাঁকশালে মূল্যবান ধাতু গলানোর পারদর্শিতা রয়েছে। আবার দিল্লির লাগোয়া নয়ডার ট্যাঁকশালে যেমন মূলত কয়েন তৈরি হয়। আবার মুম্বই ও হায়দরাবাদেও রয়েছে একটি করে মিন্ট।
তবে রামচন্দ্রের সোনা দানা যে বেছে বেছে কলকাতায় যাবে, এই ব্যাপারটা যেন রোমহর্ষক। অদ্ভূত সংযোগে এভাবেই অযোধ্যা ও রামের সঙ্গে জুড়ে গেল তিলোত্তমা।